শুক্রবার ৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Advertisement Placeholder

জ্বালানি নিরাপত্তা যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে

অর্থনীতি ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   10 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জ্বালানি নিরাপত্তা যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে

নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এক বিনিয়োগ স্থবির পরিবেশে, যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম। উল্টো মূল্যস্ফীতির চাপে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যবসা-বাণিজ্যকে পুরোদমে সচল করতে হবে। তার জন্য যে কোনো মূল্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। খরচ কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং ব্যবসায়ীরা সরকারের প্রতি এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।

রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত আলোচনায় বিপুলসংখ্যক বেকারের ভিড়ে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব, এলডিসি থেকে উত্তরণ, ব্যাংক খাতের দুরবস্থা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, এআই, যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের কথা উঠে আসে। বক্তারা অগ্রাধিকার, বাস্তবিক প্রয়োজন এবং ব্যয় সক্ষমতা বিবেচনা নিয়ে আগামী বাজেট প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।

আলোচনার প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারকে অগ্রাধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। সরকারের অগ্রাধিকার হলো– রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন। দেশকে ‘ভোগভিত্তিক’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে ‘বিনিয়োগভিত্তিক’ মডেলে নিয়ে যাওয়া, যা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে। উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি ভর্তুকি কমাতে সরকার কাজ করছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ তখনই আসে, যখন নীতি আগাম জানা থাকে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, সরকারে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ছাড়া বাজেট-বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের সমন্বিত অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদা নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে বাড়ছে। তাই বাজার মনিটরিং ও সরবরাহ শৃঙ্খলা ঠিক রাখা জরুরি। রপ্তানি খাতকে কেবল পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তাঁর বক্তব্যে সঠিক নীতি গ্রহণের চেয়ে তা বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ঔপনিবেশিক আমলের কার্যপদ্ধতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের প্রস্তাব দেন, যা অপচয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়াবে।

আইসিসি বাংলাদেশের সহসভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ বলেন, হাজার হাজার গ্যাস সংযোগের আবেদন ঝুলে থাকায় নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প মালিক দ্বিগুণ দামে সিএনজি বা ডিজেল দিয়ে কারখানা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ব্যবসার খরচ বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি প্রস্তাব করেন, বসতবাড়িতে বা রান্নার কাজে পাইপলাইনের গ্যাস বন্ধ করে সেখানে এলপিজি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হোক। অপ্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো বিলুপ্ত বা ছোট করার জন্য একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে শিল্প স্থাপনে সরকার জমির দাম, মেশিনারিজ এবং কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিচ্ছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশে উচ্চ ব্যাংক সুদ, বিদ্যুৎবিভ্রাট এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি মনে করেন, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, বরং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে হবে।

বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল দেশে শিল্পায়নের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে বলেন, একটি শিল্প দাঁড় করাতে জমি কেনা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রায় ৩৫০টি পোশাক কারখানা এবং ৫০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের টেক্সটাইল মিল মাত্র ২০০ কোটি টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে তিনি কেবল ঋণ পুনঃতপশিল না করে পুনঃঅর্থায়নের এবং রুগ্‌ণ শিল্পগুলোকে মেরামতের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু মনে করেন, সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ব্যবসার বাধাগুলো দূর করা। তিনি লুটপাট এবং ব্যবসায়িক কারণে খেলাপি হওয়া– এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করার আহ্বান জানান। ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে এখনই দরকষাকষি শুরু করার কথা বলেন। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ বলেন, আগামী ৩ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে নিতে হবে। পরোক্ষ করের বদলে আয়কর ও ব্যয়ভিত্তিক করের ওপর জোর দিতে হবে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতি পেয়েছে। সরকারের সামনে প্রধান তিন চ্যালেঞ্জ হলো– দ্রুত হ্রাস পাওয়া রাজস্ব আয়, সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারি বিনিয়োগের নিম্নমান।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিডা’ আইন সংস্কার এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর সুপারিশ করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর সুবিধা প্রদান এবং শিল্প চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মইন উদ্দিন ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের খেলাপি ঋণ পরিশোধের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান।
পিকার্ড বাংলাদেশের ডিএমডি অমৃতা ইসলাম রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন। বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অভিবাসন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। বেসিস সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর মনে করেন, সস্তা শ্রমের বদলে এখন উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমশক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম

যোগাযোগ

২১৯, ফকিরেরপুল (২য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

মোবাইল : ০১৭১৬০৯১৭৭৩

ই-মেইল: orthonitybangladesh@gmail.com