মঙ্গলবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

তিন সাগরের ঢেউ তাড়া করছে যুক্তরাষ্ট্রকে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

তিন সাগরের ঢেউ তাড়া করছে যুক্তরাষ্ট্রকে

পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে সংঘাত ও তার রেশ এখন ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশেও পৌঁছেছে। তাতে এখন পর্যন্ত সংঘাতের মূল হোতা যুক্তরাষ্ট্রের কিনার খুঁজে পাওয়ার লক্ষণ নেই। সঙ্গী হিসেবে সবশেষ স্পেনকে চেয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো এবারও একটি আঞ্চলিক সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি, যা ন্যাটোভুক্ত দেশের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ন্যাটোর সঙ্গীদের মধ্যে বিভাজনের অভিজ্ঞতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তাঁর সবশেষ এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে গ্রিনল্যান্ড ঘিরে। নতুন করে আরেকবার হলো ইরানে হামলার পর। তবে এবারের অভিজ্ঞতা আর্কটিক অঞ্চলের তুষারের মতো শীতল ও নরম নয়; বরং ন্যাটোর একাধিক দেশের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও চাপ অনুভব করছেন।

সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও মাঠের চিত্র দেখা যাক। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন। সংঘাতের পাঁচ দিনেও তারা সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। উল্টো ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নাম ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে। আরও কয়েক দিন সংঘাত চলার পরও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা টিকে গেলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য হবে বড় পরাজয়।

এখন পর্যন্ত পাল্টাপাল্টি সংঘাতের যে চিত্র উঠে আসছে, তাতে রণাঙ্গনে (আকাশপথে) ইরানই এগিয়ে আছে। বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, প্রথম চার দিনে তেহরানের করা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাতারে। সেখানে আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার মূল্যের রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের ঢেউ
১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর ছয় দিনের যুদ্ধের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা করে। এর অংশ হিসেবে এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশে প্রায় ১৯টি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এর বিনিময়ে আরব দেশগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত শনিবার থেকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর যেভাবে নাভিশ্বাস তুলেছে, তাতে ওয়াশিংটন ঠিক কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে– তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আরব দেশগুলোর অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি তাদের উৎপাদিত জ্বালানি। গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথম লেনদেন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ইরান এসব জ্বালানির কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা আরও জোরদার করে। কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস স্থাপনা এবং সৌদি আরবের অন্যতম বৃহৎ শোধনাগারে ড্রোন ছোড়া হয়। এর ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের শীর্ষ দেশ কাতার তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে। তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে ইরান কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলো ইতোমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ দিচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজ। এর কারণ, একদিকে তারা অবকাঠামোগত ক্ষতির শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ ঝুঁকির দিকে তাকালে এই দেশগুলো বিনিয়োগ সংকটেও পড়তে পারে। ইরানে আগ্রাসন হলে আরব দেশগুলোও যে অস্থির হবে– তা এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় (আপাতত) যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন যে বিপাকে আছে, তা বললে ভুল হবে কি?

ভূমধ্যসাগরে উল্টো স্রোত
বুধবার ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশ তুরস্কের দিকে যাচ্ছিল বলে দাবি করেছে আঙ্কারা। তারা জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করেছে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ন্যাটোর আর্টিকেল-৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকিরা তাকে বাঁচাতে একসঙ্গে মাঠে নামবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কে সরাসরি আঘাত হানেনি। আবার ন্যাটোভুক্ত অন্য দেশগুলোও এখনও আক্রান্ত হয়নি। তারপরও শক্তি প্রদর্শনের জন্য হলেও ট্রাম্প যেন ন্যাটোর সদস্যদের নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু তাতে বড় পরিসরে সাড়া পাওয়ার এখনও স্পষ্ট লক্ষণ নেই। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে স্পেন ও কানাডা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাজ্য চলছে গা বাঁচিয়ে। অতি উৎসাহীদের মধ্যে আছে জার্মানি ও ফ্রান্স। ইমানুয়েল মাখোঁর প্রশাসন এরই মধ্যে ভূমধ্যসাগরে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি বার্লিনের একটি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিমান হামলায় অংশগ্রহণ এবং সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনা করা হচ্ছে।

খুব কম সংখ্যক দেশই যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার ঝুঁকি নিতে রাজি না, তখন ব্যতিক্রম হিসেবে সামনে এসেছে স্পেন। যারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ট্রাম্পের শুল্ক ও বাণিজ্য বন্ধের হুমকির মুখেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধে যাব না।’ শুধু এই চার শব্দেই সানচেজের জবাব সীমাবদ্ধ থাকেনি। আরও কঠোরভাবে তিনি বলেছেন, ‘শুধু প্রতিশোধের ভয়ে মাদ্রিদ এমন কোনো কর্মকাণ্ডে সহায়তা করবে না, যা বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর এবং মূল্যবোধের পরিপন্থি।’ গত বছরের এপ্রিলে শুল্ক দিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর পর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভবত এমন সরাসরি বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি। ইরানে হামলা চালানোর পরবর্তী পরিস্থিতি তাঁকে সে অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি করল।

ভারত মহাসাগরে লঘুচাপ
এ অঞ্চলের দেশ শ্রীলঙ্কার উপকূলে অবস্থানরত একটি ইরানি রণতরীতে সাবমেরিন হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যার মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরে ঝড়ের রেশ দক্ষিণ এশিয়ায়ও পৌঁছেছে।

মূলত সংঘাত শুরুর দিন থেকেই এশিয়ার এই অংশের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ শুরু হয়। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়, সেটির বড় ক্রেতা এখানকার দেশগুলো। বুধবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সরু এই জলপথ দিয়ে জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলে স্থবিরতা আরও দীর্ঘ হলে তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশ এমনকি পূর্ব এশিয়ার পরাশক্তি চীনের জন্যও বিপাকের কারণ হবে।

চীন এরই মধ্যে তেহরানে যৌথ শক্তির আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কৌশলগত নিরাপত্তা এবং প্রভাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। বুধবার সেখানে মার্কিন সাবমেরিন হামলার ঘটনাকে তারা কতটা গুরুত্ব দেবে– সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ