শুক্রবার ৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Advertisement Placeholder

জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত রেকর্ড ছুঁতে পারে ভর্তুকি

জাতীয় ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   6 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত রেকর্ড ছুঁতে পারে ভর্তুকি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। হামলার কারণে কাতারের বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এলএনজির দাম এরই মধ্যে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। কারণ কাতার বাংলাদেশের অন্যতম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ। চলতি মাসে দুটি কার্গো আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে সরবরাহকারীদের সাড়া মিলছে না। পরিস্থিতি সামলাতে বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় গ্যাস রেশনিং শুরু করেছে সরকার।

যুদ্ধের কারণে এলএনজির পাশাপাশি ক্রুড অয়েলের দামও বেড়ে গেছে। গত মাসের এই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ক্রুডের দাম এখন প্রায় ৮৪ ডলার। যুদ্ধ শিগগিরই শেষ না হলে এই দাম শতকের ঘর পেরোতে পারে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেল প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি রেকর্ড করতে পারে বলে শঙ্কা খাতসংশ্লিষ্টদের।

তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল কমেছে ৮৬ শতাংশ। উভয় প্রান্তে প্রায় ৭০০টি জাহাজ আটকে আছে। সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো র‍্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায় যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে এশিয়ার বাজারে– বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের তেলবাহী দুটি জাহাজ সৌদি আরবে বন্দরে আটকে গেছে।

এলএনজি নিয়ে শঙ্কা বেশি
দেশে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় সরবরাহ ছিল ২৫২ কোটি ঘনফুট, যা আগের বছরের তুলনায় কম।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে ঘাটতি পূরণে বাড়ছে আমদানির এলএনজিনির্ভরতা। বর্তমানে মোট সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। ২০২৫ সালে কাতার এনার্জি ৪০টি কার্গো সরবরাহ করেছে। ওমান থেকেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কার্গো আসে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করা হয়, যেখানে সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে ভিটল, পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল, টোটাল এনার্জিস, পস্কো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনসহ বিভিন্ন কোম্পানি। কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এরই মধ্যে কাতারকে চিঠি দিয়েছে। কাতার সরাসরি নাকচ না করলেও বাতিল হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের ৯টি কার্গোর মধ্যে ছয়টির উৎস কাতার। এর মধ্যে চারটি কার্গো বিরোধপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে এসেছে। তবে ১৫ ও ১৮ মার্চ কাতার থেকে আসার কথা থাকলেও সেগুলো আটকে গেছে। এ জন্য দুই কার্গো এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে গত মঙ্গলবার দরপত্র ডাকা হলেও চুক্তিবদ্ধ ২৪ কোম্পানির কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। গতকাল বুধবার আবার দরপত্র ডাকা হয়েছে, যা আজ বৃহস্পতিবার খোলা হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক পরিচালক বলেন, হয় কোম্পানিগুলোর কাছে এলএনজি নেই অথবা তারা তা ধরে রেখেছে, যাতে দাম আরেকটু বাড়ে। গতকাল স্পট মার্কেটে এলএনজির ইউনিটপ্রতি দাম ২৫ ডলার উঠেছে, যা ফেব্রুয়ারিতেও ছিল ১২ থেকে ১৩ ডলার।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, এই মাসে ৯টি কার্গো আসার কথা থাকলেও দু-একটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। পরের কার্গোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে দুটি, আফ্রিকা থেকে আসবে একটি। সেগুলোর সূচি এখন পর্যন্ত ঠিক রয়েছে। আগামী মাসে ফের কাতার থেকে কার্গো আসার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, সমস্যা হচ্ছে স্পট মার্কেটে এলএনজি মিলছে না। কারণ হতে পারে দুটি। এক, আমাদের এফএসআরইউ যেহেতু ফিক্সড, তাই কখন কোন জাহাজ আসবে তা সূচি মেনে চলতে হয়। কারণ একটা জাহাজ আটকে রাখলে ৭৮ হাজার ডলার প্রতিদিন জরিমানা গুনতে হয়। এ জন্য সূচিতে ব্যাঘাত ঘটলে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব কার্গো আসছে, সেগুলো ১৫ মার্চের মধ্যে নাও পৌঁছাতে পারে। এমনও হতে পারে, ওদের কাছে বিকল্প কোনো উৎস নেই।

বাড়বে খরচ
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে ১০৯টি কার্গো আমদানিতে খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮৭৭ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছর ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় ছিল তিন হাজার ২২ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৮৫৫ মিলিয়নের বেশি ডলার। চলতি বছর ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। আমদানি বাড়ায় খরচ এমনিতেই বাড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গড় এলএনজি মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৮ দশমিক ৪৩ ডলারে উঠে যায়, যা ২০২৪ সালে নেমে আসে ১২ দশমিক ৮৪ ডলারে। ২০২৫ সালের জুনে ছিল ১৩ দশমিক ৫২ ডলার এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ০২ ডলারে। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ১২ ডলারে এলএনজি কিনেছিল। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির দাম পড়ছে ৯ থেকে ১০ ডলার। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এলএনজির দাম ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। যুদ্ধ বন্ধ না হলে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামেই এলএনজি কিনতে হবে বাংলাদেশকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, সংঘাত দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ। এতে আমদানি খরচ বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং ভর্তুকির পরিমাণ আরও ফুলেফেঁপে উঠবে।

গ্যাস রেশনিং, কমবে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন
এলএনজি আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পটভূমিতে বিকল্প হিসেবে গ্যাস রেশনিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রেশনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হবে। বিদ্যুৎ থেকে পাঁচ কোটি ঘনফুট, বাকিটা সার করাখানার অংশ থেকে কাটা হবে। এখন বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে ৮৫ কোটি ঘনফুট। বেশি গরম না থাকায় এখন লোডশেডিং নেই। তবে পাঁচ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হলে ৫০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কম হবে। ফলে লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামলাতে হবে বিদ্যুৎ বিভাগকে।

বোরো মৌসুমের কারণে সারের চাহিদা থাকায় তিনটি কারখানা চালু রাখা হয়েছে। সেসব কারখানায় গতকাল দেওয়া হয়েছে ১৭ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। রেশনিংয়ের কারণে সব কারখানা বন্ধ রেখে শুধু শাহজালাল সার কারখানা চালু রাখা হবে।

জ্বালানি তেল
সৌদি রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো থেকে ১ লাখ টন করে মোট ২ লাখ টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজের ২ মার্চ বন্দর ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জাহাজ দুটি সৌদিতেই রয়েছে। জাহাজ দুটির ১৩ মার্চ নাগাদ চট্টগ্রামে এসে পৌঁছার কথা ছিল। এই চালান দুটি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। যদিও চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে যেসব জাহাজ আসবে সেগুলোর রুটে কোনো সমস্যা নেই। বর্তমানে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেড ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে।

বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ লাখ টন। এর প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম মোটামুট স্থিতিশীল থাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরশেন (বিপিসি) সাম্প্রতিক বছরগুলোত কয়েক হাজার কোটি টাকা করে মুনাফা করছে। সংস্থাটির মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭২ ডলার অতিক্রম করলেই লোকসান গুনতে হয়। চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৭ ডলার থেকে গত মঙ্গলবার রাতে ৮৪ ডলারে পৌঁছেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে যা ২৬ শতাংশ বেশি।

ভর্তুকির পাহাড়
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছয় হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। খাতসংশ্লিষ্টদের আগে ধারণা ছিল, এই ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে তা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা বিদ্যুৎ বিভাগের।

এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৫ বছরে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জানিয়েছে, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না, সিস্টেমলস কমিয়ে খরচ সমন্বয় করা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সিস্টেমলস কমিয়ে লোকসান সামলানো সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সামলাতে ভর্তুকি বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম

যোগাযোগ

২১৯, ফকিরেরপুল (২য় তলা), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

মোবাইল : ০১৭১৬০৯১৭৭৩

ই-মেইল: orthonitybangladesh@gmail.com