শুক্রবার ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

পশ্চিম তীরে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করছে ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ২০৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

পশ্চিম তীরে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করছে ইসরায়েল

অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণে মাসাফার ইয়াত্তার ছোট্ট গ্রাম খাল্লেত আল-ডাবা। গত মে মাসের এক সকালে হঠাৎ গ্রামটির শান্ত পরিবেশ কেঁপে ওঠে বুলডোজার ও অন্যান্য যন্ত্রের শব্দে। সঙ্গে ছিল ইসরায়েলের সেনারা। তারা দলে দলে গ্রামটির বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের করে দেয়। গবাদি পশু ছেড়ে দেওয়া হয় খোলা মাঠে।

ঘটনাটি গত ৫ মের। দিন শেষে খাল্লেত আল-ডাবার ফিলিস্তিনিদের ছোট একটি সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। গত বুধবার আলজাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন জানায়, চলতি বছর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী এ ধরনের চারটি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এ ধ্বংসযজ্ঞ ‘নাকবা’র চেয়ে কম কষ্টের নয়। এটি এক ‘নতুন নাকবা’; অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপকভাবে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও জাতিগত নির্মূলের ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ওই ধ্বংসযজ্ঞ চলাকালে কয়েক ডজন সামরিক, সাঁজোয়া যান ও জিপ গ্রামটি ঘিরে রাখে। পরিবারগুলোর নারী-শিশুসহ অন্য সদস্যরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বলন্ত সূর্যের নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন। চোখের সামনে তাদের বাড়িঘর, ঘরের পেছনের দেয়াল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তখন থেকে নতুন জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ কয়েক বছর আগে তৈরি গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যরা অসহায় অবস্থায় থাকছেন নাজুক তাঁবুতে। শীত ও গ্রীষ্মের চরম তাপমাত্রায় এসব তাঁবু থেকে গা বাঁচানো যায় না। পার্শ্ববর্তী আত-তুবানি গ্রামের কাউন্সিলপ্রধান মোহাম্মদ রাবিয়া বলেন, ‘এ ঘটনা খাল্লেত আল-ডাবার মানুষের জীবনের সব মৌলিক সুবিধা– পানি, বিদ্যুৎ, সৌরশক্তি, পানির কূপ, আবর্জনার পাত্র, এমনকি রাস্তার বাতি গুঁড়িয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রস্তরযুগে ফিরে গেছি। গুহা ও তাঁবুতে থাকছি। নেই জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। তবু কেউ গ্রাম ছেড়ে যাননি।’

সামরিক প্রশিক্ষণ অঞ্চল
খাল্লেত আল-ডাবা পাহাড়ঘেরা ১২টি ফিলিস্তিনি গ্রামের একটি। জাতিসংঘের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাসাফের ইয়াত্তায় এক হাজার ১৫০ জনের বাস। তবে রাবিয়া বলেছেন, সেখানে প্রকৃত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার। তারা মূলত ভেড়া পালন, গম ও বার্লি চাষ করেন। এটি তাদের আয়ের প্রধান উৎস। পশ্চিম তীরের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমির মতো ইসরায়েল ১৯৮০-এর দশকে ওই এলাকার একটি অংশকে সামরিক প্রশিক্ষণ অঞ্চল ‘ফায়ারিং জোন ৯১৮’ ঘোষণা করে। এর পর থেকেই তারা স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি গবেষণা সংস্থা আকেভট জানায়, পশ্চিম তীরে এ সামরিক প্রশিক্ষণ অঞ্চল ঘোষণার কাজ ১৯৮১ সালে তখনকার ইসরায়েলি কৃষিমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের প্রস্তাবিত ছিল। পরে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন। খাল্লেত আল-ডাবার বাড়িঘর বারবার সামরিক আদেশে ধ্বংস করা হয়। স্থানীয়রা বলেন, অনুমতি ছাড়া নির্মাণ, সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকার কাছাকাছি অবস্থান বা অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনে জমি দাবি; কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই– ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর।

ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসের (এমএসএফ) ব্যবস্থাপক ফ্রেডেরিক ভ্যান ডোঙ্গেন বলেন, মাসাফের ইয়াত্তায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড হলো বৃহত্তর পরিসরে জাতিগত নির্মূল নীতির অংশ। এর লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের এ এলাকা থেকে সরানো।

গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ‍গুহাও
নিজেদের বসতি ধ্বংসের দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ৬৫ বছর বয়সী সামিহা মুহাম্মদ আল-ডাবাবসেহ আছেন। জন্মের পর থেকে এ নারী ওই গ্রামে থাকেন। তাঁর মুখেই কয়েক দশকের কষ্ট ও সংগ্রামী জীবনের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘কয়েক মিনিটের মধ্যে সেনারা ঘরে ঢুকে আমাদের জোরপূর্বক বের করে দেয়। কিছু নেওয়ার অনুমতি দেয়নি– না খাবার, না কাপড়। তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে, এটি তোমার জমি নয়; এখানে তোমার ঘর বা ঠিকানা থাকবে না।’

ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সামিহারার একটি গুহায় আশ্রয় নেন। তারা এটি নিজেরাই খুঁড়ে বানিয়েছিলেন। পরিবারের নারী ও শিশুরা গুহার ভেতর ঘুমাত; পুরুষরা বাইরে মাটিতে থাকতেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর এ গুহাও ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ