
বিনোদন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশের সংস্কৃতি যখন ইউরোপীয় উপনিবেশ কিংবা সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসনে হারানোর পথে তখন বাংলার ঐতিহ্যিক দার্শনিক চরিত্র ‘খনা’ নাটকের ১০০তম প্রদর্শনী পূর্তি বাংলা নাট্যচর্চায় মাইলফলক।
নাট্যদল বটতলার আয়োজনে এ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে গত ১০-১১ এপ্রিল ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যে বাংলার বহমান গণমানুষের সংস্কৃতির মেলা তা প্রকৃত অর্থে দেশজবোধে উদ্বুদ্ধ করে। এটি যেমন বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংস্কৃতির আধুনিক উপস্থাপনা, তেমনি উৎসবের আয়োজনটিও ছিল গণমানুষের ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন; যা কর্পোরেটদের প্রচলিত ‘লোক উৎসব’ এর প্রথাগত মোটিভ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাটকটি রচনা করেছেন সামিনা লুৎফা নিত্রা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী হায়দার।
নাটকটি নানা কারণেই গুরুত্ববহ। এ নাটকের উপস্থাপন রীতি বহমান বাংলার নিজস্ব রীতি। বাংলাদেশের নাট্যচর্চা যখন শেকসপিয়র, মলিয়ের, ইবসেন অর্থাৎ ভিনদেশি নাটক বা নাট্যচরিত্র নিয়ে ব্যাপ্ত তখন বাংলার ঐতিহ্যবাহী দার্শনিক কন্যা ‘খনা’ চরিত্র নিয়েও ঐতিহ্যবাহী রীতিতে নাটক নির্মাণ হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকেই পুনর্নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক চেতনাকেই সম্মানিত করে। পাশ্চাত্যের সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল কিংবা আধুনিক কান্ট, হেগেলের মতোই ‘খনা’ বাংলার দার্শনিক।
বাঙালির গৃহস্থ কৃষিজীবনে ‘খনার বচন’ এখনও খুব সমাদৃত। তবে ‘খনা’ আসলে কে ছিলেন তা জানা দুষ্কর। খনার প্রকৃত নাম লীলাবতী। পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে ও জ্ঞানের ঈর্ষায় যার জিহ্বা কেটে বাকরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ‘খনা’ একদিকে যেমন বাংলার আবহাওয়া কৃষি, প্রকৃতির দার্শনিক, অন্যদিকে পরিবার-সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা। নারীর স্বাধিকারের প্রতীক।
‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’, ‘ব্যাঙ ডাকে ঘন ঘন, বৃষ্টি হবে শীঘ্রই জেনো’ এ রকমের অসংখ্য বচন গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের মুখে মুখে আজ প্রচলিত। ‘খনা’র প্রধানত দুটো কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। ‘বটতলা’ নাট্যদল প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ‘খনা-মিহিরের ডিবি’কে আশ্রয় করে প্রাচীন বাংলার চন্দ্রকেতুর কিংবদন্তিকে গ্রহণ করেছেন। যদিও সম্প্রতি অনেকে খনার বচনকে সংকলিত বলেও মনে করেন। কিন্তু বটতলা নাট্যদল ‘খনা’র চরিত্র, তাঁর জীবনের যন্ত্রণা, প্রজ্ঞা, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিয়োগান্তক পরিণতিকে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার আঙ্গিকে নৃত্য-গীত-অভিনয়-সংলাপ-বর্ণনা-বন্দনায় চারদিকের দর্শকবেষ্টিত পালামঞ্চরীতিতে উপস্থাপন করেছেন। ফলে শুরু থেকেই নাটকটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০১০ সালে খনা প্রথম মঞ্চে আসে। দেশে-বিদেশে ৯৯টি প্রদর্শনী শেষে শততম প্রদর্শনী করে বটতলা।
১০ এপ্রিল ভোরে অরূপ রাহীর পরিচালনায় ‘উদয়ভানু সঙ্গ’ অধিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হয়। প্রাতঃক্রিয়ায় ধ্যান-যোগ, রাগ-সাধনা-সংগীত বাঙালির নিজস্ব দিনাচার। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের অতীতকে ভুলিয়ে দিতে চায়। বটতলা নাট্যদল ঐতিহ্যবাহী বাঙালি শিল্পসাধনার ধারাকেই আয়োজনে বেছে নিয়েছেন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় যন্ত্রসংগীত, সরোদ ও বেহালা বাদন। পরে ছিল মানজুর আল মতিন, আকিক আল ওয়াসি, বিদ্যুৎ সরকার, পিয়াস আকবরের পরিবেশনা।
লায়েকা বশীর উপস্থাপন করেন প্রভাত সংগীত। একে একে শিশু কিশোরদের গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন হয়। ১০টায় তক্ষশিলা বিদ্যালয় পরিবেশন করে ব্রতচারী নৃত্য। চিত্রশিল্পী মনজুর রশীদের তত্ত্বাবধানে ‘আঁকিবুকিতে বসন্ত’ এবং মৃৎশিল্পী খোকন কারিগরের তত্ত্বাবধানে ‘মাটির পাঠশালা’ শিরোনামের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। কাকতাড়ুয়ার পাপেট থিয়েটার উপস্থাপন করে।
প্রথম দিন দুপুরের পর পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও ধূয়া গান। তা ছাড়াও আমন্ত্রিত শিল্পীদের গান পরিবেশিত হয়। ‘খনা’ নাটকের শতশত পূর্তিকে ভিত্তি করে ‘খনার আলাপ’ শিরোনামে অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য রাখেন খনার নাট্যকার সামিনা লুৎফা নিত্রা। খুশী কবিরের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন শিরীন হক, তাহমিনা আহমেদ, তৌকীর আহমেদ, ফয়েজ জহির, তাসলিমা আক্তার, আবু সাঈদ তুলু, সামিউন জাহান দোলা। শেষে সৌম্য সরকার ও ব্রাত্য আমিন নির্মিত তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
দুদিন ব্যাপী এ মেলায় নানা স্টলে দেশীয় পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়। দ্বিতীয় দিন দুপুরের পর সংগীত পরিবেশন করেন গীতলবঙ্গ, সাইরেন ও সায়ান। সন্ধ্যা ৭টায় প্রদর্শিত হয় ‘খনা’। এতে অভিনয় করেন, সামিনা লুৎফা নিত্রা, মোহাম্মদ আলী হায়দার, কাজী রোকসানা রুমা, ইভান রিয়াজ, ইমরান খান মুন্না, তৌফিক হাসান, শারমীন ইতি, শেউতি শাহগুফতা প্রমুখ।
বটতলার এ উৎসব প্রথাগত কোনো উৎসব নয়। এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপরীতে ঐতিহ্যবাহী বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির জাগরণমুখী উৎসব। সাম্রাজ্যবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদী সংস্কৃতিতত্ত্বের বিপরীতে এ আয়োজনের বৈচিত্র্য আবহমান বাংলা ভূখণ্ডের গণমানুষের বহুমাত্রিক জীবনবোধ, জীবনচর্চা ও সংস্কৃতির মিলন মেলায় পরিণত হয়ে উঠেছিল।
