শনিবার ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

জেগে থাকা শহরে প্রথম প্রহরে নীরব শ্রদ্ধার জনস্রোত

জাতীয় ডেস্ক   |   শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৬৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জেগে থাকা শহরে প্রথম প্রহরে নীরব শ্রদ্ধার জনস্রোত

রাত সাড়ে ১১টা ছুঁইছুঁই। ফেব্রুয়ারির হালকা শীত আর অদ্ভূত এক আবেগে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে ঢাকা। বছরের অন্য রাতগুলোর মতো নয় এই রাত। এর ভেতরে জমা রয়েছে ইতিহাস, স্মৃতি আর অপেক্ষা। একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর দিন আজ।

রাত ১২টার একটু আগে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছাতেই বোঝা যায়, আজ রাত ঘুমানোর জন্য নয়। সারি সারি ফুলের দোকান। রজনীগন্ধা, গাঁদা, গোলাপ আর গ্লাডিওলাসে ভরে উঠেছে ফুটপাত। তরুণ-তরুণী, পরিবার, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা ফুল কিনতে ব্যস্ত। কেউ তোড়া বানাচ্ছেন, কেউ ফুলের থোঁকা থেকে নিজ হাতে বেছে নিচ্ছেন শ্রদ্ধার ফুল।

ফুল বিক্রেতা খায়রুল বলছিলেন,এই একটা রাতেই মনে হয় ফুলের আলাদা সম্মান হয়। সবাই শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ সংলগ্ন এলাকায় ভিড় ঘন হতে থাকে। মাঝেমধ্যে পুলিশের টহল গাড়ি ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবকেরা পথ নির্দেশনা দিচ্ছেন।

টিএসসি এলাকায় পৌঁছে দেখা যায়, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাংস্কৃতিক দলের ব্যানার হাতে মানুষের জটলা। কেউ নিজের মতো করে কবিতা আবৃত্তি করছে, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ফুল ও জাতীয় পতাকা হাতে। একুশের রাত যেন নিজেই ভাষা হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে দল বেধে বেরিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। মেয়েদের সাদা-কালো শাড়ি, ছেলেদের সাদা-কালো পাঞ্জাবি, প্রায় সবার পা খালি। কেউ একা, কেউ দলবদ্ধভাবে নীরবে হাঁটছেন শহীদ মিনারের দিকে।

শিক্ষার্থী উর্মি বলছিলেন, খালি পায়ে হাঁটাটা আমাদের কাছে শ্রদ্ধা আর বিনয়ের প্রতীক।

জগন্নাথ হল, ফুলার রোড ও আশপাশের আবাসিক এলাকা থেকে ধীরে ধীরে মানুষের ঢল নামতে থাকে। ছোট ছোট জটলা, কেউ বন্ধুদের অপেক্ষায়, কেউ সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে সারিবদ্ধ হচ্ছেন। তাদের কারও হাতে ফুল, চোখে শ্রদ্ধাভরা দৃষ্টি।

রাত তখন প্রায় ১২টা। শহরের যান চলাচল কমে এলেও মানুষের চলা থামছে না। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে কেউ ছবি তুলছেন, কেউ লাইভে বলছিলেন “আমরা শহীদ মিনারের পথে”। সব পথ যেন এক জায়গায় গিয়ে মিলছে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদনের পরপরই সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। তখন যেন বাঁধভাঙা মানুষের স্রোত ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে বেদির দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গসংগঠন—সবাই নিজ নিজ ব্যানার নিয়ে সারিবদ্ধভাবে শ্রদ্ধা জানাতে থাকে।

সেন্ট্রাল মাইকে ভেসে আসে- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…। গানের সঙ্গে মিলেমিশে শোনা যায় কবিতা আবৃত্তি। কেউ দাঁড়িয়ে শুনছে, কেউ চোখ বন্ধ করে অনুভব করছে মুহূর্তটিকে।

রোভার স্কাউট সদস্যদের টিএসসি থেকে প্রস্তুত হয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তারা ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষকে পথ দেখাতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, যাতে পুরো আয়োজন শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে।

রাত বাড়তে থাকে, কিন্তু মানুষের ঢল কমে না। ছোট শিশুদের হাত ধরে বাবা-মায়েদের আসতে দেখা যায়। কেউ ফুল দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকছেন কয়েক মিনিট, কেউ আবার দূরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

ফুল দেওয়া শেষে অনেককে শহীদ মিনারের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। বন্ধুদের জন্য, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য কিংবা শুধু এই রাতটুকু আরও কিছুক্ষণ অনুভব করার জন্য। কেউ ফুটপাতে বসে চা খাচ্ছেন, কেউ রিকশার জন্য অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ হাঁটতে শুরু করেছেন ফিরতি পথ- শাহবাগ, নীলক্ষেত কিংবা ক্যাম্পাসের হলের দিকে।

মধ্যবয়সী একরামুল হক বলছিলেন, ফুল দেওয়া শেষ হলেও মনে হয় একটু দাঁড়িয়ে থাকি। এই রাতটা দ্রুত শেষ হয়ে যাক, এটা মন চায় না।

এই রাত উৎসবের নয়, অথচ উৎসবের মতো প্রাণময়। শোকের নয়, অথচ গভীর স্মৃতিময়। ইতিহাস এখানে বইয়ের পাতায় নয়,মানুষের পদচারণায় বেঁচে থাকে। তারই চিত্র দেখা যায় রাত গভীর হবার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকায়।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ