শুক্রবার ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে যাচ্ছে সরকার

জাতীয় ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে যাচ্ছে সরকার

বৈশ্বিক অস্থিরতার পটভূমিতে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের চাপ সামলাতে বিদ্যুতের পাইকারি এবং খুচরা দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যেই উচ্চ পর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বিদ্যমান আইন কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ– তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

৯ এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে মন্ত্রিসভাকে সুপারিশ দেবে।

আইন নিয়ে বিতর্ক
আইনিভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও সংস্থাটি ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে গণশুনানির মাধ্যমে নিয়মিত ট্যারিফ নির্ধারণ শুরু করে। উৎপাদন ব্যয়, আমদানি খরচ ও ভর্তুকির হিসাব বিবেচনায় নিয়ে এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতার প্রধান ভিত্তি ছিল। তবে ২০২২ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে সরকার সরাসরি দাম নির্ধারণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেয়। ফলে গণশুনানি ছাড়াই গেজেটের মাধ্যমে মূল্য সমন্বয়ের পথ তৈরি হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার আবারও গণশুনানি প্রক্রিয়া পুনর্বহালের উদ্যোগ নেয় এবং বিইআরসিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করে।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন করে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ আইনি কাঠামোর সঙ্গে আংশিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আইনে বলা আছে, দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এলে তা বিইআরসির মাধ্যমে যাচাই ও গণশুনানির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই ঘাটতিকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ নেই। আগে ঘাটতির প্রকৃত কারণ ও বৈধতা নিরূপণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিতে হবে। এরপর যদি বাস্তব ঘাটতি থাকে, তবে তা নিয়ে গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, দাম বাড়ানোর বর্তমান প্রক্রিয়া ভোক্তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।

এদিকে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী বিইআরসি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণের দায়িত্বে থাকলেও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, মন্ত্রিসভা অনুমোদিত বিধিমালার ভিত্তিতেই কমিশন মূল্য নির্ধারণ ও সমন্বয়ের কাজ করবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেই বিধিমালার খসড়া বারবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও এখনও তা অনুমোদন হয়নি। ফলে বিদ্যমান আইনি ফাঁক ও প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগ নিয়েছে সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কতটা গভীর। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন হলেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। স্বল্প মেয়াদে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও তেল কিনে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা ছাড়া বিকল্প নেই, তবে এতে খরচ বাড়ছে এবং অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার নতুন হওয়ায় এখনই দাম বাড়িয়ে অজনপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। পরিস্থিতি যেভাবে নাজুক হচ্ছে, তারা কতদিন এই ধারা ধরে রাখতে পারবে তা দেখার বিষয়।

জ্বালানি নিয়ে চাপে সরকার
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে আমদানি খরচ বহুগুণ বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিলে শুধু স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। জ্বালানি তেলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ৪২ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, আর জুন পর্যন্ত আরও প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকেও ভর্তুকি কমিয়ে জ্বালানির দাম বাজারভিত্তিক করার চাপ রয়েছে। সব মিলিয়ে বিপুল ভর্তুকি অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে, যদিও মূল্যস্ফীতি ও জনভোগান্তির শঙ্কায় সরকার এখনও সরাসরি দাম বাড়ায়নি। তবে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার লক্ষণ না দেখায় হয়তো সরকারকে দাম সমন্বয়ের দিকে এগোতে হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ