বৃহস্পতিবার ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া দিন আজ

জাতীয় ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া দিন আজ

‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!/ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/কারে দাও ডাক/হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!’ (বৈশাখ– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সর্বজনীন ও হৃদয়ছোঁয়া এক দিন। যেটি কেবল একটি দিন বা উৎসবই নয়; বাঙালির জীবনে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ঐক্য এবং প্রাণের মিলনমেলাও। স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩।

পুরোনোকে বিদায় দিয়ে, পুরোনো বছরের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হলো নতুন বছরের পথচলা। সেই সঙ্গে বাঙালির হৃদয়ে নতুন সূর্যের আলোয় জেগে উঠল নতুন প্রত্যাশা। কালের গর্ভে হারাবে পুরোনো বছরের সব পঙ্কিলতা, সব পাপ-তাপ আবর্জনা ধুয়ে-মুছে নতুন দিনের উজ্জ্বল আভায় হাসবে স্বদেশ ভূমি, আর বর্ণিল সুখচ্ছটায় ভাসবে মানবজীবন– এমন কামনা নিয়েই নববর্ষের সূচনা হলো।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন। পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশ ও বিশ্বের সব মানুষের উত্তরোত্তর সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন তারা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলা নববর্ষের সূচনা কোনো কল্পিত বা লোকজ ঘটনা নয়। বরং এর রয়েছে এক বাস্তব প্রয়োজন ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলা সাল প্রবর্তন করেন। সে সময় রাজস্ব আদায় হতো হিজরি চন্দ্রপঞ্জিকা অনুযায়ী, যা ছিল পুরোপুরি চন্দ্রনির্ভর। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে এটি ছিল অনুপযোগী। কারণ কৃষির মৌসুম অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন ইত্যাদি কৃষি মৌসুম ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মিশ্র সৌর ও চন্দ্র পদ্ধতির ভিত্তিতে তৈরি হয় ‘তারিখ-ই-ইলাহি’’, যা-ই পরে পরিচিতি পায় বাংলা সাল নামে। এই পঞ্জিকা প্রস্তুত করেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী।

যদিও শুরুতে নববর্ষ ছিল প্রশাসনিক কর আদায়ের দিন। ধীরে ধীরে এটি রূপ নেয় একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে। গ্রামবাংলার মানুষ একে একত্রে পালন করতে শুরু করে, রাজস্ব পরিশোধের পর আয়োজিত হতো ‘হালখাতা’, যেখানে ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব শেষ করে মিষ্টিমুখ করতেন নতুন খাতা খুলে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষরাও পহেলা বৈশাখের আনন্দোৎসব করেন। তারাও নিজেদের মতো করে নিজেদের স্বাজাত্যবোধ বজায় রেখে উৎসবের রং ছড়ান। সেখানেও চমৎকার সব ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। অন্যান্য উৎসব নিজেদের মধ্যে বৃত্তবন্দি থাকলেও পহেলা বৈশাখের উৎসব তেমনটা নয়। বিদায়ী বর্ষের চৈত্রসংক্রান্তির দিন এবং নতুন বর্ষের প্রথম দিনকে ঘিরে পার্বত্য জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব‌‌‌ উদযাপিত হয়। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক বলে অভিহিত করেন। পুরো পার্বত্য এলাকায় এর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বৈসাবি নামে।

শোভাযাত্রা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত বছরের পহেলা বৈশাখ উদযাপন, বিশেষ করে এই দিনের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার আয়োজনকে ঘিরে যে বিতর্ক ছড়িয়েছিল– তার রেশ এবারও দেখা গেছে। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম আয়োজন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি বদলে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে আয়োজিত হলে এই বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও ইউনেস্কোর অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতির সনদে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’ নামেই বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলা বছরকে বরণ করে নেওয়ার এই উৎসবটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়।

এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ-পরবর্তী প্রথম বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রার প্রস্তুতিকালেই এর নাম নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা উঠেছিল। অবশ্য সরকারি সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত এটি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে আয়োজিত হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ এই স্লোগানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি বের হবে। পরে এটি শাহবাগ মোড় ঘুরে টিএসসি মোড়, শহীদ মিনার, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র এবং দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তা দিয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে গিয়ে শেষ হবে। শোভাযাত্রা ছাড়াও গোটা এলাকাজুড়ে বসবে নববর্ষের মেলা।

তবে পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম দিয়েই আলাদা শোভযাত্রা করার কথাও জানিয়েছেন একদল সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মী। ‘বর্ষবরণ পর্ষদ’ এর ব্যানারে এবং ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ স্লোগানে এই শোভাযাত্রাটি আজ সকালে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে বের হবে।

আরও আয়োজন
গোটা জাতি আজ প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে মাতবে। বর্ণিল আয়োজনে নতুন বছর উদযাপনের অনুষ্ঠানমালা থাকবে গোটা দেশজুড়ে। ঢাকায় ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ ছাড়াও সারাদেশে থাকবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন। গ্রাম-শহরে বৈশাখী মেলা, যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, নাগরদোলা ছাড়াও থাকবে ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা-ইলিশ। সেই সঙ্গে থাকবে হালখাতা পালনের ঐতিহ্য। ব্যবসায়ীরা লাল খাতা ও নতুন ক্যালেন্ডার বিতরণ করবেন, সঙ্গে থাকবে মিষ্টান্ন বিতরণ।

রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে ভোর সোয়া ৬টা থেকে ৮টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত থাকবে বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য আয়োজন। আগারগাঁও চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে সকালে চ্যানেল আইয়ের আয়োজনে থাকবে বর্ণাঢ্য বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে একাডেমি প্রাঙ্গণে পাঁচ দিনব্যাপী চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষ উৎসব গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। নববর্ষের দিনে আজ সকাল থেকেও থাকবে নানা আয়োজন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী রাজধানীর তোপখানা রোডের সত্যেন সেন চত্বরে দিনব্যাপী লোকসংস্কৃতি উৎসব ও বৈশাখী আড্ডার আয়োজন করেছে। সেখানে থাকবে চারু ও কারুপণ্যসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ