শুক্রবার ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

বাংলাদেশ-ভারত বিশ্বকাপ বিতর্কে পাকিস্তান কেন জড়াল

খেলাধুলা ডেস্ক   |   বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশ-ভারত বিশ্বকাপ বিতর্কে পাকিস্তান কেন জড়াল

ভারতে আসন্ন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ সরে যাওয়ায় পাকিস্তানও তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পিসিবির চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি বলেছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী শুক্র বা সোমবার নেওয়া হবে।

নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের কারণে আগে থেকেই পাকিস্তানের সব ম্যাচের ভেন্যু নির্ধারণ করা হয় শ্রীলঙ্কায়। বাংলাদেশও ভারতের মাটিতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে শ্রীলঙ্কায় ভেন্যু চেয়েছিল। কিন্তু তা না মেনে আইসিসি তাদের বিশ্বকাপ সূচি থেকে বাংলাদেশের নাম বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে যুক্ত করেছে।

ভেন্যু পরিবর্তনে লজিস্টিক জটিলতার অজুহাতে পূর্ণ সদস্য দেশকে আসর থেকে বাদ দেওয়ার এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এটিকে আইসিসির দ্বিমুখী নীতি হিসেবেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ঢাকার পাশে দাঁড়িয়েছে ইসলামাবাদ।

পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি গত সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করেন। তবে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টে পাকিস্তান দল যাবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি।

পাকিস্তান কেন জড়াল
এই বিতর্কটি আপাতদৃষ্টিতে খেলার মনে হলেও নেপথ্যে আছে গভীর রাজনৈতিক উত্তেজনা। দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলে আসা এক বৈরী সম্পর্কের ইতিহাস আছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের সময় থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরীতা তৈরি হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহযোগিতা করে ভারত। কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে ফাটল ধরে। অন্যদিকে ইসলামাবাদের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ঢাকার

এই ঘনিষ্ঠতার জেরে বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার টানাপোড়েনের সময় আইসিসির সমালোচনা করেন পাকিস্তানের মহসিন নাকভি। গত শনিবার আইসিসিকে তিনি বলেন, ‘আপনারা দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করতে পারেন না।’

মহসিন নাকভি বলেন, ‘একটি দেশ (ভারত) যা খুশি তাই করতে পারবে আর অন্যদের উল্টোটা করতে হবে- আপনারা (আইসিসি) এমন কথা বলতে পারেন না। তাই আমরা এমন অবস্থান নিয়েছি। স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি, বাংলাদেশের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে। তাদের বিশ্বকাপে খেলা উচিত। ক্রিকেটে তারা একটি অন্যতম প্রধান অংশীদার।’

পাকিস্তানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কয়েক দিনের মধ্যে পিসিবি প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা মোস্তাফিজকে পিএসএল- এ নিবন্ধনের প্রস্তাব দেয়।

পাকিস্তানের একটি গণমাধ্যমে খবর এসেছে, পিসিবি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করতে পারে। তবে মহসিন নাকভি সরাসরি তেমন কোনো ইঙ্গিত দেননি। এমন জল্পনাও আছে যে, বাংলাদেশের প্রতি প্রতীকী সংহতি জানাতে পাকিস্তান হয়তো ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে না।

বিশ্বকাপে পাকিস্তানের প্রথম ম্যাচ আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। এ অবস্থায় আইসিসি এবং পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান এহসান মানি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহারের বিষয়ে বোর্ডকে সতর্ক করেছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, এটি করলে খেলাধুলার মধ্যে রাজনীতিকে টেনে আনা হবে।

পাকিস্তান নাম প্রত্যাহার করলে কী হবে
পাকিস্তান ও ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শত্রুতা অনেক আগেই ক্রিকেট মাঠে গড়িয়েছে। গত বছরের মে মাসে চারদিনের সংঘাতের পর ক্রিকেট তাদের কাছে একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরের এশিয়া কাপে দুই দলের খেলোয়াড়দের হাত না মেলানো এবং অস্ত্রের প্রতীক প্রদর্শনের কথা অনেকেরই জানা। নতুন করে তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পাচ্ছে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে।

লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের অধ্যাপক এবং ‘ক্রিকেট ইন পাকিস্তান: নেশন, আইডেন্টিটি অ্যান্ড পলিটিক্স’ বইয়ের লেখক আলী খান বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন ‘সম্পূর্ণ নীতিগত অবস্থান’। যদি একই পরিস্থিতিতে (ভেন্যু) ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই ছাড় দেওয়া যেতে পারে, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন নয়?

অধ্যাপক আলী খান বলেন, বর্তমানে আইসিসি বর্তমানে যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেটির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সোচ্চার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে আসর বয়কটের হুমকি দেওয়াটা একটু বাড়াবাড়ি।

আলী খানের পরামর্শ হলো, পাকিস্তানের উচিত আইসিসির প্রতিটি সভায় জোরালোভাবে এই বৈষম্য নিয়ে কথা বলা। অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গেও এ বিষয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার।

ক্রিকেটবিষয়ক লেখক ভারতের শারদা উগ্রা মনে করেন, পাকিস্তানের এই হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য সম্ভবত একটি শক্তিশালী জোট গঠন করা। পাকিস্তান যদি আসর থেকে সরে আসে, তবে সেটি নিশ্চিতভাবেই ক্রিকেট বিশ্বকে হতাশ করবে। এর ফলাফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

বাংলাদেশ-ভারত বিশ্বকাপ বিতর্ক কী নিয়ে
কয়েক সপ্তাহ আগে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। এমন সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দিয়েছিল বিসিসিআই। কারণ হিসেবে ভারতীয় বোর্ড পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিল। এরপর বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার প্রস্তাব দেয় বিসিবি।

বাংলাদেশের যুক্তি হলো, তাদের একজন খেলোয়াড়ই যদি ভারতে নিরাপদ না থাকেন, তবে তারা পুরো দল এবং কোচিং স্টাফ কীভাবে নিরাপত্তা পাবে। তাই তারা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না।

কিন্তু আইসিসি ম্যাচ স্থানান্তরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা জানায় বাংলাদেশ দলের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হুমকি নেই। আইসিসির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন জয় শাহ। তিনি নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে। আইসিসিতে কয়েক দফায় আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত আসরের সূচি থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়।

কেন দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ
২০২৪ সালের শেষের দিকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিন বছর মেয়াদী একটি সমঝোতা করে দেয় আইসিসি। সমঝোতা অনুযায়ী, দুই প্রতিবেশী দেশের যেকোনো একটি যখন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে, তখন অন্য দেশ তাদের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার সুযোগ পাবে।

২০২৫ সালের নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। সেখানে পাকিস্তান তাদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় খেলেছে। এমনকি ২০২৬ সালের পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও পাকিস্তানের জন্য একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম এই সমঝোতার দিকে ইঙ্গিত করে আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন- একই ধরনের অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশের দাবি কেন নাকচ করে দেওয়া হলো।

বিসিবি এবং আইসিসি যখন অচলাবস্থায় আটকে ছিল, তখন পিসিবি নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবিতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে এই দ্বন্দ্বে যোগ দেয়। গত সপ্তাহে আইসিসির বোর্ড সভায় একমাত্র পাকিস্তানই পূর্ণ সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সমর্থন জানায়। বোর্ডের অন্য সদস্যরা প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশ যদি ভারতে খেলতে রাজি না হয়, তাহলে অন্য কোনো দলকে সুযোগ দেওয়া হোক।

‘ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতা নেই’
লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের অধ্যাপক আলী খান মনে করেন, বর্তমানে আইসিসির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। এর পেছনে আছে ভারতের বিশাল আর্থিক প্রভাব। ফলে আইসিসি এখন কার্যত ভারত সরকারের মুখপত্রে পরিণত হয়েছে। এর জন্য অবশ্য বাকি দেশগুলোও দায়ী। কারণ তারা ভারতের সব নির্দেশনা মেনে নেয়।

শারদা উগ্রা এই ইস্যুতে ইসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নীরবতারও সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশ। তাই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার উচিত ছিল পরিস্থিতিকে আরও ন্যায়সঙ্গত করতে ভূমিকা রাখা। কিন্তু তাদের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে তারাও বিসিসিআই- এর কাছে নতি স্বীকার করে আছে। এমন আচরণ করছে যেন তাদের কোনো ক্ষমতাই নেই।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ