
বিশ্ব ডেস্ক | শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

শুল্কযুদ্ধ, কূটনৈতিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের পর অবশেষে মুখোমুখি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম চীন সফর করলেন ট্রাম্প। সফরে দুই নেতা সম্পর্ক স্থিতিশীল করার বার্তা দিলেও, শেষ পর্যন্ত কে বেশি কূটনৈতিক সুবিধা পেলেন- তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে।
দুই দিনের সফরে বেইজিংয়ে ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বৈঠকের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, ঝংনানহাই বাগানে অনানুষ্ঠানিক আলাপ এবং ঐতিহাসিক ‘টেম্পল অব হেভেন’ পরিদর্শনে অংশ নেন দুই নেতা। সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে এরিক ট্রাম্প, টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংসহ মার্কিন করপোরেট খাতের একাধিক শীর্ষ ব্যক্তি।
বৈঠক শেষে শি জিনপিং বলেন, দুই দেশ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তিনি ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের সঙ্গে নিজের ‘চীনের পুনরুত্থানের’ লক্ষ্য তুলনা করেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই সফরকে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে উল্লেখ করে জানান, বেশ কিছু ‘চমৎকার বাণিজ্য চুক্তি’ হয়েছে। শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন ট্রাম্প। পরে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জানান, আগামী শরতেই শি ওয়াশিংটন সফর করতে পারেন।
তবে বড় প্রশ্ন ছিল, চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের সমাধান কতদূর এগোল। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। পাল্টা জবাবে চীন বিরল খনিজ রপ্তানিতে শর্ত আরোপ করে। সাম্প্রতিক আলোচনায় শুল্ক হ্রাস, বিনিয়োগ সহজ করা এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চুক্তির ঘোষণা আসেনি।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, চীন ২০০ বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কৃষকদের সমর্থন ধরে রাখতে এসব চুক্তি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও ইরান ইস্যুতেও আলোচনা হয়েছে দুই নেতার মধ্যে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না পায় এবং হরমুজ প্রণালি খোলা থাকে- এ বিষয়ে উভয় পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি। তবে চীনের বক্তব্য ছিল তুলনামূলক সতর্ক, বেইজিং কেবল যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের পক্ষে অবস্থান নেয়।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর আলোচনার বিষয় ছিল তাইওয়ান। শি জিনপিং স্পষ্টভাবে ট্রাম্পকে সতর্ক করেন, তাইওয়ান ইস্যুতে ভুল পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত ডেকে আনতে পারে। চীনের লক্ষ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন না করে এবং অস্ত্র বিক্রি কমায়।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে শির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেননি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন অস্ত্রচুক্তি বাতিল করবে কিনা। বরং তিনি এটিকে ‘ভালো নেগোশিয়েটিং চিপ’ বলে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘কারও স্বাধীনতার জন্য ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে চাই না।’
বৈঠকে শি জিনপিং ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র কথা তুলে ধরেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক সম্পর্কে বেঁধে রাখতে চাইছেন, যেখানে ওয়াশিংটন তাইওয়ানসহ সংবেদনশীল ইস্যুতে চীনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে না।
সফরের শেষে দুই নেতাই নিজ নিজ দেশের জনগণের সামনে কূটনৈতিক সফলতার বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখনও ভিন্ন দুই কৌশলগত পথেই হাঁটছে। তাইওয়ান, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্নে দুই দেশের মৌলিক বিরোধ এখনও বহাল।
