
জাতীয় ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৯৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বনেতাদের প্রতি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে আরও কার্যকর অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলুন, আমরা এমন একটি মর্যাদাকর, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তুলি, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। এ বিষয়ে তিনি পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরে বলেন, এগুলো কার্যকর করলে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য, বৈষম্য ও আর্থিক অস্থিরতা সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে ‘টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রথম দ্বিবার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে অর্থায়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ অনুষ্ঠান ছাড়াও এদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। খবর বাসসের।
টেকসই উন্নয়ন-বিষয়ক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা জানান, এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়া তাঁর জন্য গর্বের বিষয়। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও দায়িত্বের বিষয় একসঙ্গে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, চতুর্থ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সম্মেলনে নেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বছরে চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ করা চ্যালেঞ্জিং হলেও অপরিহার্য। বাংলাদেশের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার দায়িত্ব নিচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, দারিদ্র্য একজনের স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সম্পদের ন্যায্য প্রবেশাধিকার হলো ন্যায়বিচারের মূল।’
টেকসই উন্নয়নের জন্য তিনি অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন। সেগুলো হলো– ন্যায্যভাবে দেশীয় সম্পদ উত্তোলনে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সমর্থন থাকা প্রয়োজন। কর ব্যবস্থা গতিশীল, স্বচ্ছ ও বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতা কাঠামোর আলোচনায় এ বৈষম্য দূর করতে হবে। সামাজিক ব্যবসা, যৌক্তিক অর্থায়ন এবং এমন উদ্যোগ নিতে হবে যা চাকরি, অন্তর্ভুক্তি ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে হবে। ঋণকে কঠোরতা নয়, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের হাতিয়ারে রূপান্তর করতে হবে। জনগণ, বিশেষ করে যুবসমাজকে জানতে হবে কীভাবে সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অনুষ্ঠানে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ নেতার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে কথা বলেছেন।
আগামী নির্বাচন গণতন্ত্রে নতুন যুগের সূচনা করবে
প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী সাধারণ নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়; দেশের গণতন্ত্রে এটি নতুন যুগের সূচনা করবে। নিউইয়র্কে মঙ্গলবার প্যারিসের মেয়র অ্যানে হিদালগোর সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক উদ্যোগ এবং বিশ্বের নানা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বৈঠক
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গা। বৈঠকে বাংলাদেশে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার, চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি চুরি হওয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার বিষয়েও আলোচনা হয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে অজয় বঙ্গা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত সহায়তার আশ্বাস দেন অজয় বঙ্গা।
ড. ইউনূস চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকীকরণ ও পুনর্গঠনে সহায়তা করার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরই এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। আসুন, আমরা একসঙ্গে এটির উন্নয়ন করি। নেপাল, ভুটানসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি উপকৃত হবে। এর মাধ্যমে লাখো মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
এলডিসি থেকে উত্তরণে ডব্লিউটিওর সমর্থন কামনা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ যাতে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে, সে জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) পূর্ণ সমর্থন প্রয়োজন। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. এনগোজি অকোনজো-ইওয়েলার সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক দেশ বাণিজ্য সুবিধা হারানোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ যেন একই সমস্যার মুখে না পড়ে, সে জন্য ডব্লিউটিওর কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। অকোনজো-ইওয়েলা বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা মঙ্গলবার একাধিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক, চিলির সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান ও উরুগুয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের সঙ্গে বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন হবে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি আশা করেন। নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য বীমা সম্প্রসারণ, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসের সঙ্গে বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস যৌথ অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
আনলক বিগ চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড পেলেন ড. ইউনূস
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত থেয়ারওয়ার্ল্ডের বার্ষিক উচ্চ পর্যায়ের গ্লোবাল এডুকেশন ডিনারে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। সোমবার নিউইয়র্কের একটি হোটেলে এ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূসকে দেওয়া হয় থেয়ারওয়ার্ল্ডের আনলক বিগ চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড। শিক্ষা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা এবং মানবকল্যাণে প্রতিশ্রুতির স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মাননা প্রদান করা হয়। শিশুদের জন্য নিবেদিত আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা থেয়ারওয়ার্ল্ড বিশ্বব্যাপী শিক্ষা সংকট নিরসন ও নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা বিকাশে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষাবিষয়ক বিশেষ দূত ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এবং থেয়ারওয়ার্ল্ডের চেয়ার ও গ্লোবাল বিজনেস কোয়ালিশন ফর এডুকেশনের নির্বাহী চেয়ার সারা ব্রাউন। অনুষ্ঠানে শিক্ষার রূপান্তরমূলক শক্তিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
অধ্যাপক ইউনূসের পাশাপাশি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডিকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। গর্ডন ব্রাউন পুরস্কার প্রদানকালে বলেন, গত ৫০ বছরে বেসরকারি খাতে কোনো প্রকল্প মানুষের দারিদ্র্যমুক্তিতে গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্যোগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। তিনি অধ্যাপক ইউনূসকে বিশ্বব্যাপী পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিহিত করেন।
পুরস্কার গ্রহণকালে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো ঋণও একটি মৌলিক মানবাধিকার। তিনি বলেন, ‘যদি আর্থিক ব্যবস্থার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত হয়, তবে পৃথিবীতে কেউ আর গরিব থাকবে না।’
