
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | ২৮৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

তালেবানরা ২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতায় ফিরে আসার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের পতন হয়। ভারত তখন দূতাবাস বন্ধের পাশাপাশি তড়িঘড়ি করে কূটনীতিক ও নাগরিকদের সরিয়ে নেয়। তবে গত চার বছরে গঙ্গার জল প্রবাহের মতো পরিস্থিতিও বদলে গেছে।
নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার নয়াদিল্লিতে তালেবান প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিকে আতিথেয়তা দিচ্ছে। মুত্তাকির নেতৃত্বে যাওয়া আফগান প্রতিনিধি দলকে দিয়েছে লাল গালিচা সংবর্ধনাও। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা মুত্তাকি সংস্থাটির অস্থায়ী ভ্রমণ ছাড়পত্র নিয়ে ভারতে গেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলা করতে ভারত বাস্তববাদী নীতির অংশ হিসেবে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। অপরদিকে সীমান্তে সংঘাতের কারণে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে অবনতি হয়েছে। এটি নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, তালেবান নেতাদের আতিথেয়তা জানানো মানে; ভারত তাদের প্রশাসনকে বৈধতা দিচ্ছে এবং কার্যত স্বীকৃতি দিচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- ভারত এখন কেন তালেবানকে স্বাগত জানাচ্ছে? তাদের বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে? নয়াদিল্লি তালেবানের কাছে থেকে কী আশা করছে। আর তালেবানই বা কী লাভ দেখছে এই ঘনিষ্ঠতায়?
বৈঠকে যা হয়েছে
সফরে মুত্তাকির সঙ্গে আছেন আফগানিস্তানের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় তারা কূটনীতি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত শুক্রবার জানান, নয়াদিল্লি কাবুলে ফের দূতাবাস চালু করবে। দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা জাতীয় উন্নয়ন ছাড়াও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতায় অবদান রাখবে। ভারত, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার প্রতি সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ।
মুত্তাকি ভারতকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। একটি যৌথ বিবৃতিতে, নয়াদিল্লি ও তালেবান উভয়ই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আফগান নেতারা ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে তাদের খনি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মোদির সরকার উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে মুত্তাকির সফরও সহজ করেছে। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দ অবস্থিত।
গতকাল সোমবার মুত্তাকি ঘোষণা দিয়েছেন, শিগগিরই কাবুল ও ভারতের বিভিন্ন শহরের মধ্যে (যেমন-পাঞ্জাবের অমৃতসর) সরাসরি ফ্লাইট চালু হবে।
ভারত কেন স্বাগত জানাচ্ছে
ভারত তালেবানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে শুরু করে ২০২২ সাল থেকে। গত দুই বছরে অনেকটা নীরবেই তালেবানকে মুম্বাই ও হায়দরাবাদের আফগান কনস্যুলেট চালুর অনুমতি দিয়েছে। ভারতের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরাও বিদেশে একাধিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মুত্তাকি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।
একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, আফগান শাসকরা সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে। যাদের হামলায় পাকিস্তানে বহু প্রাণহানি হয়েছে। তালেবান আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নয়াদিল্লিতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রাভিন ডোনথি বলেন, পাকিস্তানকে নতুন কোনো আঞ্চলিক মিত্র গড়ার সুযোগ দিতে চায় না ভারত। তাই তারা তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে বাধ্য হয়েছে। এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আদর্শগত কারণে এই সম্পর্ককে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
আফগানিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলছেন, ১৯৯০-এর দশকের তালেবানের সঙ্গে বর্তমান তালেবানের তুলনা করা যাবে না। আগের তালেবানের ওপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখনকার তালেবান কিছুটা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে। তারা আগের নেতাদের তুলনায় বিচক্ষণ।
ভারত কী চায়
দক্ষিণ এশিয়ায় সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টাল। এর নির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনি বলছেন, আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের খুব দ্রুত পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ভারত বিষয়টি ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। ফলে এই বাস্তবতা ও আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সংঘাত যেভাবে বাড়ছে তা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলছেন, পাকিস্তান এখন ভারত ও আফগানিস্তান উভয়ের ‘শত্রুতে’ পরিণত হয়েছে। ইসলামাবাদের সঙ্গে কাবুল ও নয়াদিল্লির কোনও না কোনও বিষয় নিয়ে সমস্যা চলছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভারত-আফগানিস্তান মিত্রতে পরিণত হচ্ছে।
ভারত সফরের সময় তালেবান মন্ত্রী যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে কেউ যাতে ভারতের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা হবে।
তালেবানের স্বার্থ কী
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তালেবানরা কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায়ের ওপর জোর দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেবল রাশিয়া তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। অনেক নেতার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে। এ অবস্থায় নয়াদিল্লিতে সপ্তাহব্যাপী সফর তালেবানের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও দিল্লিতে তালেবান নেতাদের সফরের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে মোদি প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে মুত্তাকির সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘটনা। এটি নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রীরাও সরব হন। যদিও পরদিন নারী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেন মুত্তাকি।
তালেবান নেতারা এরপর দিল্লিতে আফগান দূতাবাসও ঘুরে দেখেছেন। কূটনৈতিক এমন স্বীকৃতি ছাড়াও ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তান অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গতকাল সোমবার মুত্তাকি দিল্লিতে বসবাসরত আফগান শিখ ও হিন্দুদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের আবার আফগানিস্তানে ফিরে ব্যবসা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন। সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টালের নির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনি বলছেন, বিশ্ব যেভাবেই দেখুক না কেন তালেবানের কাছে ভারতের সমর্থন পাওয়াটা বড় বিষয়।
