
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

পাল্টা শুল্ক বাতিলের খবর অনেকের কাছে স্বস্তির হলেও, এ নিয়ে অনিশ্চয়তা আগামী কয়েক মাস থাকতে পারে। মার্কিন ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে কর আরোপের শঙ্কা করছেন। অন্যদিকে পরিশোধিত অর্থ ফেরত পেতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, আদালত ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক বাতিল করায় এখন নতুন করে আর কী ঘটতে পারে? বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে এ নিয়ে একটি পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্য আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ)’ -এর মাধ্যমে আরোপ করা শুল্ক। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, আদালতের রায়ের কারণে বাণিজ্য চুক্তি করা অনেক অংশীদার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির চেয়ারম্যান জশ লিপস্কির মতে, যেসব দেশ ইতোমধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করেছে তারা তা বজায় রাখতে পারে। কারণ, এই সমঝোতা কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। ফলে অনেকেই এটি নষ্টের ঝুঁকি নিতে চাইবে না। কেবল যেসব দেশের চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে, তারা এখন আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ওয়েন্ডি কাটলার মনে করেন, ঘোষিত চুক্তিগুলো থেকে অংশীদাররা সরে যাবে না। তারা খুব ভালো করেই জানে, এমন পদক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিরূপ হবে।
অর্থ ফেরতের দীর্ঘ পথ
এই রায়ের ফলে শুল্কের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের সূত্রপাত হলো। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বৈশ্বিক শুল্ক বাবদ ১৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই অর্থ ফেরতের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মাসগুলোতে নিম্ন আদালতে এ বিষয়ের ফয়সালা হতে পারে।
আর্থিক পরিষেবার সংস্থা আইএনজির বিশ্লেষক কার্স্টেন ব্রজেস্কি এবং জুলিয়ান গেইব বলছেন, ধারণা করা হচ্ছে মার্কিন ‘কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে। অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। যে আমদানিকারক অর্থ ফেরত চাইবেন, তাকে পৃথকভাবে মামলা করতে হবে।
অর্থ ফেরত চাওয়ার প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজারের বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান আইনি লড়াই শুরু করেছে। তবে শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা সম্ভবত আগামী পাঁচ বছর আদালত পাড়াতেই পড়ে থাকব।’ যা থেকে বোঝা যায় অর্থ ফেরত পাওয়ার পথ খুব সহজ হবে না।
আরও অস্থিরতা
আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প বিকল্প ক্ষমতার আওতায় আমদানির ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন (পরে আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়েছেন)। এই পদক্ষেপ সাময়িক। কিন্তু এর মাধ্যমে ট্রাম্প ভবিষ্যতে আরও স্থায়ী শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করে রাখলেন। যা নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই শুল্ক আরোপের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ধারা-১২২ এর প্রয়োগ করেছেন। এর আওতায় শুল্ক আরোপের মেয়াদ থাকে ১৫০ দিন। এরপর কংগ্রেস সময়সীমা না বাড়ালে শুল্কটি বাতিল হয়ে যায়। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ধারা-৩০১ এর অধীনে অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলনের বিষয়ে নতুন তদন্ত করবেন। ফলে নতুন আরোপিত শুল্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার একটি আশঙ্কা আছে।
জশ লিপস্কি বলছেন, আদালতের রায় ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে কেবল একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ব্যবসায়ীদের জন্য সামনে আরও অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হবে। বিভিন্ন দেশের জন্য বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও কঠিন হতে পারে।
‘একই পর্যায়ের শুল্ক ফেরানো হবে’
আর্থিক পরিষেবার সংস্থা আইএনজি বলছে, আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম হাতিয়ারটি হারিয়েছেন।
বিষয়টি মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সাক্ষাৎকারেও ফুটে উঠেছে। গত শুক্রবার ফক্স নিউজকে বেসেন্ট বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ)’ -এর ওপর ভিত্তি করে আরোপিত শুল্কগুলো ছিল অন্যান্য দেশের ওপর প্রভাব খাটানোর বিশেষ অস্ত্র। এর মাধ্যমে দেশগুলোকে অল্প সময়ের মধ্যে আলোচনার টেবিলে বসানো সম্ভব হয়েছিল।
স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা দেশগুলোর জন্য পুনরায় একই পর্যায়ের শুল্ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনব। তবে এটি এখন কিছুটা পরোক্ষ ও কিছুটা জটিল উপায়ে করা হবে।’
শুল্কের হার কি কমবে?
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির ‘দ্য বাজেট ল্যাব’-এর তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে সাধারণ মার্কিন ভোক্তারা গড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশ কার্যকর শুল্ক হারের সম্মুখীন হবেন। ২০২৫ সালকে বাদ দিলে ১৯৪৬ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ হার। এর আগে এই শুল্ক ছিল ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
ট্রাম্প আরও স্থায়ী শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করলেও আর্থিক সংস্থা নেভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিদার লং মনে করেন, শুক্রবারের এই রায় শুল্ক নীতিতে একটি আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে।
হিদার লংয়ের ধারণা, সামগ্রিকভাবে শুল্কের হার কমে আসার সম্ভাবনা আছে। ভবিষ্যতে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে আরও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতে পারে।
