
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ১০৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবের মধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এতটাই বিরূপ পর্যায়ে গেছে যে, সৌদি আরব এখন আমিরাতকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে।
এই বিরোধ ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এর প্রভাব পড়তে পারে সুদানসহ আফ্রিকায় চলমান অন্য সংঘাতগুলোতে। এসব সংঘাতে রিয়াদ ও আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের বিপরীত পক্ষগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তাই নতুন করে উপসাগরীয় দুই ধনী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব, নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বীতার ক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে ইয়েমেন।
সৌদি আরব বরাবরই ইয়েমেনকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে। ২০১৫ সালে তারা ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দমনে অভিযান চালায়। এ নিয়ে সমালোচনা হলে পরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুতিদের সমঝোতায় পৌঁছানোর কূটনীতিতে জোর দেয়।
অপরদিকে আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)’ কে সমর্থন দিচ্ছে। সৌদি আরবের কূটনীতিকদের ধারণা ছিল, পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা বাতিল করতে এসটিসিকে চাপ দেবে আমিরাত। পাশাপাশি ইয়েমেনের জোট সরকার কাঠামো ‘প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)’এর সঙ্গে আলোচনায় বসতে উৎসাহ দেবে।
কিন্তু মঙ্গলবার আমিরাতের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলে সৌদি আরব। তাদের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে বেশ কিছু যানবাহন লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায়। অভিযোগ করে, এসব যানবাহনে করে এসটিসিকে অস্ত্র সরবরাহ করছিল আমিরাত। কিন্তু তা অস্বীকার করেছে আবুধাবি। একইসঙ্গে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারের ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামের মুখে নিজেদের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।
ইয়েমেনে বহু বছর ধরে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে আমিরাত। ১৯৯০ সালে উত্তর ইয়েমেনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল স্বাধীন ছিল। সেটি ফের স্বাধীন করার লক্ষ্য নেয় এসটিসি। আমিরাতও তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে এসটিসিকে সমর্থন দেওয়া শুরু করে। চলতি মাসে এসটিসি দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম প্রদেশ হাদরামাওতে তাদের বাহিনী পাঠায়। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় পুরো অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেল উৎপাদনের কয়েকটি ক্ষেত্র।
এসটিসির এমন অগ্রগতিকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে সৌদি আরব। এরপরই তারা এসটিসিকে দমিয়ে রাখতে আবুধাবির ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে শুরু করে। তবে এখন পর্যন্ত আমিরাত পিছু হটেনি। মঙ্গলবার তারা ইয়েমেনে থাকা হাতে গোনা সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও তাতে এসটিসির প্রতি সমর্থনে কোনো ভাটা পড়বে না বলে মনে করা হচ্ছে।
আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আবদুল্লাহ এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, ইউএই কখনোই তার মিত্রদের হতাশ বা ছেড়ে যায় না। রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি দিয়ে সব সময় সমর্থন দেয়।
অপরদিকে চ্যাথাম হাউসের ইয়েমেন ও বৃহত্তর উপসাগর বিষয়ক গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি মনে করেন, ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর। স্থানীয় প্রক্সিদের মাধ্যমে বছরের পর বছর পরোক্ষ প্রতিযোগিতার পর এখন বিরোধ সরাসরি সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইউএইর বিরুদ্ধে এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলছে, যা তাদের দক্ষিণ সীমান্তে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
আল মুসলিমি আরও বলেন, এই সংঘাত ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো ও সেখানে প্রভাবের ভারসাম্য নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মৌলিক মতপার্থক্যকে প্রতিফলিত করে। ভৌগোলিকভাবে তুলনামূলক দূরে থাকা সত্ত্বেও ইউএই সেখানে (ইয়েমেন) হস্তক্ষেপ ও পরীক্ষামূলক কৌশল নিয়েছে।
ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বহু বছর ধরেই জমছিল। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে ২০১৭ সালে কাতারকে ঘিরে উপসাগরীয় সংকটের মিল আছে।
এদিকে সৌদি ও আমিরাতের উত্তেজনাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে হুতি বিদ্রোহীরা। কারণ এই দুটি দেশই ইরান সমর্থিত হুতিদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। মুসলিমি বলেন, হুতিরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, এক সময় তাদের বিরুদ্ধে যারা একসঙ্গে লড়াই করেছিল তারা এখন বিভক্ত হয়ে গেছে।
সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, সৌদি আরব ও আমিরাতের দ্বন্দ্ব এবং হুতিদের মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টায় ইয়েমেন ভবিষ্যতে গভীর সংকটে পড়তে পারে।
