
অর্থনীতি ডেস্ক | মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ১২৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় তা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রথম চার মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ পিছিয়ে থাকা সংস্থাটিকে বাড়তি ৫৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে যেখানে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়, সেখানে গতিহীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন যুক্তিতে প্রথমবারের মতো বাড়ানো হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয়ে গতি না এলেও চলতি অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। মূলত সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোসহ নানা কারণে পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কারণ সরকারি ব্যয় নির্বাহে সরকার ঋণ বাড়াতে চায় না। তাছাড়া রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকেও চাপ রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করে, এনবিআরকে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে। কর আদায়ে সময় বাড়ানোর তাগিদ থেকেই এ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের পর বছর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকা এনবিআরকে বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া অযৌক্তিক। কারণ লক্ষ্যামাত্রা অনুযায়ী যদি রাজস্ব আয় না হয়, অন্যদিকে ব্যয় যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে ঋণ গ্রহণই হবে ব্যয় নির্বাহের উৎস। বর্তমানে ঋণ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, ঋণ নিয়ে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হচ্ছে। তাই পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানার পরামর্শ তাদের।
সংশোধিত বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রাজস্ব বাড়ানোর নির্দেশনা পেয়ে কোন খাতে কত কর বাড়ানো হবে, তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। গত ২০ নভেম্বর সংস্থাটির গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগের এক চিঠিতে এনবিআরের অধীনে দপ্তরগুলোর কাছে বাড়তি এই রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও চাওয়া হয়েছে। অনুবিভাগগুলোকে খাতভিত্তিক ও মাসভিত্তিক বিস্তারিত বিভাজন করে আগামী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগে হার্ডকপি ও সফটকপি পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ওই চিঠিতে বলা হয়, আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায়ের আগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বাড়ানো হয়েছে ১৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। কাস্টমস অনুবিভাগ এ রাজস্ব আহরণ করবে।
স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর আদায়ের আগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৮৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। নতুন লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। বাড়ানো হয়েছে ২০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। ভ্যাট অনুবিভাগ এ রাজস্ব আহরণ করবে।
আয়কর এবং ভ্রমণ কর আদায়ের আগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৮৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রেও বাড়ানো হয়েছে ২০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আয়কর অনুবিভাগ এ রাজস্ব আহরণ করবে।
এনবিআরের কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি থাকায় অর্থবছরের প্রথম চার (জুলাই-অক্টোবর) মাসে রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে বছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়বে বলে মনে করেন তারা। তারা বলেন, করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে এনবিআর। তবে মূল বাজেটের তুলনায় রাজস্ব আদায় ১১ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তারা।
এনবিআরের হিসাব অনুসারে, গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় এক লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১৫ শতাংশ। আগের বছর একই সময়ে আদায় হয় এক লাখ তিন হাজার ৪০৭ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সার্বিকভাবে রাজস্ব বাড়ানোর কর্মসূচি সরকারকে নিতে হবে। তবে এনবিআর যেখানে প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকে, সেখানে এ বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনসহ নানা কারণে অর্থনীতির গতি শ্লথ। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায় বাড়ানো খুবই কঠিন। তাই রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানা জরুরি। তা না হলে এমন অবস্থা হবে যে, ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
