
শিক্ষা ডেস্ক | বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৩৯০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সোমবার দুপুর ১টা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বসে ছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন) সিরাজুল ইসলাম। সন্তান রুবাইয়াত সাদাত সামী মাত্র দুই নম্বরের জন্য এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পায়নি। ছেলের এমন ফল বিস্মিত করেছে তাঁকে। তাই ছয়টি বিষয়ে খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করেছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ফল তৈরি প্রক্রিয়ার কোথাও কোনো ভুল হয়েছে।
সিরাজুল ইসলামের মতো বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের ভিড় বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে। অনলাইনে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করে প্রিন্ট কপি নিয়ে এসেছেন ব্যক্তিগত তদবিরে। সেখানে কথা হয় ভিকারুননিসা নূন কলেজের ছাত্রী তানিশা তন্ময়ের মা আফরোজা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে আশানুরূপ ফল পায়নি। অথচ ক্লাসে ওর চেয়ে সব সময় পিছিয়ে থাকা দুই সহপাঠী জিপিএ ৫ পেয়েছে।’ তাঁর বক্তব্য, এটা হতেই পারে না। তাঁর মেয়ে মেধাবী।
বোর্ডের করিডোরে কথা হয় ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে পরীক্ষা দেওয়া এক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে। তিনি জানান, ইংরেজিতে ফেল করেছেন। ভালো পরীক্ষা দিয়েও ফল খারাপ হয়েছে। এর কারণ বুঝতে পারছেন না। তাই খাতা চ্যালেঞ্জ করেছেন।
একই সময়ে কথা হয় মোহাম্মদপুরের ঢাকা স্টেট কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম মনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর কলেজের মানবিক বিভাগের ‘ফার্স্ট গার্ল’ ফেল করেছেন। তাঁর সঙ্গে
টানা– পরপর রোল নম্বরের পাঁচ শিক্ষার্থী একসঙ্গে ফেল করেছেন, যা কখনোই হতে পারে না। তাই এটা নিয়ে বোর্ডে কথা বলতে এসেছেন তিনি।
দেখা যাচ্ছে, এদের মতো প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করছেন বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে অনেকেই অভিযোগ করছেন– ভালো পরীক্ষা দিয়েও পরীক্ষকের অবহেলা, গাফিলতি বা নম্বর প্রদানে অসাবধানতার কারণে প্রত্যাশিত ফল হচ্ছে না। এতে তাদের কেউ কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, এমনকি আত্মহননের মতো মর্মান্তিক সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর হিসাবে দেখা গেছে, খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদনকারীর সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ে-কমে। তবে ফল পরিবর্তনের হার থেকে বোঝা যায়, অধিকাংশ আবেদনেই নম্বর অপরিবর্তিত থাকছে। গড়ে প্রতিবছর আবেদনকারীর মাত্র আড়াই শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ শতকরা ৯৭ জনের ফল অপরিবর্তিত থেকে যায়।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। বাকিদের ফল অপরিবর্তিত থেকেছে।
তাহলে পুনর্নিরীক্ষা করে লাভ কী
অভিভাবকদের অনেকে মনে করেন, খাতা চ্যালেঞ্জ করলে নতুনভাবে খাতা দেখা হয়, নম্বর দেওয়া হয়। আসলে তা ঘটে না।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, আবেদনকারীদের পরীক্ষার খাতা নতুনভাবে মূল্যায়ন নয়; শুধু শিক্ষকদের দেওয়া নম্বরগুলো নতুনভাবে গণনা করা হয়। খতিয়ে দেখা হয়, খাতার মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেওয়া হয়েছে কিনা, নম্বরের মধ্যে যোগে কোনো ভুল হয়েছে কিনা।
তাহলে পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করে লাভ কী– এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় একজন পরীক্ষার্থী ভালো নম্বর পেলেও তা হিসাব কষতে বা নির্ধারিত জায়গায় বসাতে ভুল হতে পারে। খাতা যারা দেখেন, তারাও তো মানুষ। তবে আমরা কেউই এ ধরনের ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ ফল প্রত্যাশা করি না। এ জন্য যেসব শিক্ষক খাতা দেখায় ভুল বা অবহেলা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
অবশ্য এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর খাতা চ্যালেঞ্জকে পাবলিক পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়নের প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনাস্থা বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। নাম প্রকাশ না করে তারা বলেন, কিভাবে কতটুকু যৌক্তিক মূল্যায়ন হচ্ছে, তা নিয়ে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সন্দিহান। খাতা দেখার জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় কিনা, সেটিও নিশ্চিত নন অভিভাবকরা।
সংকট কোথায়
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খাতা পুনর্নিরীক্ষা প্রক্রিয়া এতটাই সীমিত যে প্রকৃত ভুল ধরা পড়ে না। একই উত্তর ভিন্ন পরীক্ষক মূল্যায়ন করলে বড় পার্থক্য দেখা যায়– এটা গবেষণাতেও প্রমাণিত।
একাধিক কর্মকর্তার মতে, শিক্ষকদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণের অভাব, খাতা যাচাইয়ের সময়সীমার চাপ এবং পরিদর্শনের দুর্বলতা এখনও বড় সমস্যা। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ফল পরিবর্তনের হার কম মানেই খাতা মূল্যায়নে ভুল কম– এমন নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘খাতা মূল্যায়নে ভুল থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এই ভুলগুলো কেন ঘটছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। মূল কারণ হলো, ফল দ্রুত প্রকাশ করার তাগিদে আমরা অনেক সময় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারছি না।’
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যখন খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করে এবং তাদের ফল পরিবর্তন হয়, তখন বোঝা যায় প্রথম মূল্যায়নটি যথাযথ ছিল না। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ। দ্রুত ফল দিতে গিয়ে তাদের স্বল্প সময়ে অনেক খাতা দেখতে হয়। আবার অনেক শিক্ষক খাতা দেখা অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে তারা যত বেশি খাতা দেখতে পারেন ততই আয় বাড়ে। কিন্তু সময় সীমিত থাকার কারণে প্রতিটি খাতা পর্যাপ্ত মনোযোগ পায় না, ফলস্বরূপ মূল্যায়নে ত্রুটি ঘটে।
মনিনুর রশিদ বলেন, আমাদের দেশে এখনও সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন মানদণ্ড নেই। একজন শিক্ষক কীভাবে কত নম্বর বা গ্রেড দেবেন, তার কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা অনেক ক্ষেত্রে থাকে না। ফলে মূল্যায়ন হয়ে যায় অত্যন্ত সাবজেকটিভ। একই শিক্ষক ভিন্ন সময়ে একই খাতা দেখলে ভিন্ন মার্ক দিতে পারেন, এমনকি দুই শিক্ষক একই উত্তরের মূল্যায়ন ভিন্নভাবে করতে পারেন। তাই ন্যায্য মূল্যায়নের জন্য একক মানদণ্ড বা রুব্রিক তৈরি করা এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাতা মূল্যায়নে যে সামান্য (২% বা ৩%) ভুল হয়, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই ফলের ওপর। এটি তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
