
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে শিল্পটিতে একচ্ছত্র অধিকার ধরে রেখেছিল চীন। লুকিয়ে রাখা হয়েছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর গোপনীয়তার চাদরে। এটিই হয়ে উঠেছিল দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র– অর্থনীতি, কূটনীতি আর মর্যাদার অনন্য সমন্বয়।
তখনকার বিশ্বে বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই শিল্পটির নাম রেশম। কেউ রেশম কীট পাচার বা উৎপাদন প্রক্রিয়া ফাঁস করলে কঠোর শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। বিলাসবহুল এই সুতার পেছনের প্রযুক্তি চুরির চেষ্টাও হয়েছিল অনেকবার। সেই সময় অনেক চাহিদা থাকলেও উৎপাদন ছিল খুবই সীমিত। এটি শুধু সম্রাট, রাজা-রানী এবং উচ্চপদস্থ অভিজাতদের হাতে যেত।
রেশমের গুরুত্ব এতটাই ছিল, চীন থেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্যপথটির নাম হয়ে যায় সিল্ক রোড। এই পথ দিয়েই পণ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জ্ঞান আদান-প্রদান হয়েছে। ‘সিল্ক: অ্যা ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি’ বইয়ের লেখক ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী আরাথি প্রসাদ বলেন, ‘রেশমের মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি আছে, এ জন্য এটিকে জাদুকরি মনে হয়।’
এই সুতা তৈরি হয় রেশম পোকা থেকে। তারা তুঁত পাতা খেয়ে বড় হয় এবং এগুলোর মাথার গ্রন্থি থেকে তরল বের হয়ে কোকুন বা গুটি তৈরি করে। রেশমের জন্ম নিয়েও আছে বিখ্যাত কিংবদন্তি। চীনা কিংবদন্তি অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ সালের দিকে প্রাচীন চীনের কিংবদন্তি সম্রাট হুয়াংদির স্ত্রী সম্রাজ্ঞী লেইজু একদিন তুঁত গাছের নিচে বসে চা পান করছিলেন। হঠাৎ একটি রেশম গুটি তাঁর চায়ের কাপে পড়ে যায়। গরম পানিতে গুটিটি খুলে বেরিয়ে আসে ঝলমলে সুতা। যদিও ইতিহাসবিদরা বলেন, এটা হয়তো শুধু এক কল্পকাহিনি, যা রেশমের রহস্যময়তা ঘিরে গড়া এক রূপকথা। প্রত্নতত্ত্ব বলছে, চীন রেশম ব্যবহার করত এরও হাজার বছর আগে।
যেভাবে চুরি হয় রেশম প্রযুক্তি
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ডিকলাইন অ্যান্ড ফল অব দ্য রোমান এম্পায়ার’ গ্রন্থে লিখেছেন, দুই নেস্টোরিয়ান ভিক্ষু ফাঁপা বাঁশের লাঠির মধ্যে লুকিয়ে রেশম পোকার ডিম চুরি করে নিয়ে যান। এই ডিমগুলো তারা দেন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট জাস্টিনিয়ানের হাতে। সম্রাট সেই ডিম দিয়ে শুরু করেন রেশম উৎপাদন।
এদিকে, চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু শুয়ানজাং তাঁর ‘গ্রেট ট্যাং রেকর্ডস অন দ্য ওয়েস্টার্ন রিজিওনস’ ভ্রমণকাহিনিতে অবশ্য এক ভিন্ন গল্প বলেন। তৎকালীন খোতান রাজ্যের (পূর্ব তুর্কিস্তান) রাজা রেশম উৎপাদনের প্রযুক্তি হস্তগত করতে বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর তিনি চীনের এক রাজকন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। রাজি হলে রাজকন্যাকে রাজা গোপনে বার্তা পাঠান, ‘আমাদের এখানে রেশম নেই। আপনি যদি অভিনব রেশম পোশাক ছাড়া থাকতে না চান, তাহলে আপনার কিছু ডিম নিয়ে আসা উচিত।’ রাজকন্যা তাঁর সুসজ্জিত মাথার অলংকারের মধ্যে লুকিয়ে রেশম ডিম নিয়ে যান।
তবে আধুনিক গবেষকরা বলেন, রেশম ডিম এতদিন বেঁচে থাকতে পারে না। বরং রেশম পোকা বাণিজ্যের মাধ্যমেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে পৌঁছেছিল। এর পর থেকেই রেশম হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্যের এক প্রতীক। হান রাজবংশের (খ্রিষ্টপূর্ব ২০২-খ্রিষ্টাব্দ ২২০) সময়ে চীন প্রতিবছর ২০ হাজার পাউন্ডের বেশি রেশম কাপড় উৎপাদন করত। রোমান সাম্রাজ্যে সেগুলো বিক্রি হতো স্বর্ণের দামে।
আজ রেশম শুধু কাপড় নয়। এ এক সভ্যতার প্রতীক। এটি মানবজাতির প্রথম বিলাসিতার গল্প, যা আজও আমাদের কল্পনাকে ছুঁয়ে যায়।
