
অর্থনীতি ডেস্ক | মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশের মূল্যস্ফীতি, সুদহার ও খেলাপি ঋণ কখনো কম ছিল না। নানাভাবে এসব কম দেখানো হয়েছে। আর মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা–সব সূচকে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। আজ বা দুবছর পরে এলডিসি থেকে উত্তরণ হতেই হবে। ফলে কেবল এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আলোচনা না করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার ওপর জোর দিতে হবে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়তে হবে।
মঙ্গলবার ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতের ওপর এলডিসি উত্তরণের প্রভাব; বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন গভর্নর। ঢাকার বনানীতে হোটেল শেরাটানে আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতা, ব্যাংকারসহ অনেকেই বক্তব্য রাখেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
গভর্নর বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি সোমালিয়ার মতো দেশের সাথে এলডিসি তালিকায় থাকবো, নাকি মর্যাদা দিয়ে বিশ্ব দরবারে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাবো। তিনি বলেন, একটা দেশ থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। আমানত প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে নেমেছিলো। এখানে মুদ্রানীতি কঠোর হবে না কেন? এরপরও দেশের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশে নামানো গেছে। এটা যদি সম্ভব হয়, আগামীতে ৩–৪ শতাংশে কেন নামানো যাবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কখনো কম ছিল না। ৬ থেকে ৮ শতাংশে ছিল। খেলাপি ঋণও কম ছিল না। তবে বিভিন্নভাবে তা কম দেখানো হয়েছে। আর সুদহারে নয়–ছয় ছাড়া সব সময়ই উচ্চ ছিল। উচ্চ সুদেই এখানে ব্যবসা করে এসেছে। আমরা আর নয়–ছয় করবো না। সুদহার কমাতে হলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। আর এটা করতে হবে ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর মাধ্যমে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলত ফিরেছে। ডলারের দর ১২২টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে এই রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বাজার থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মতো কেনার ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশ থেকে যখন লুট হয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কি করেছে। আমরা কার্যকর ব্যবসায়ী সংগঠন দেখতে চাই, পাপেট নয়। ব্যাংক খাতের স্থায়ী সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে বেশ কিছু আইন সংশোধনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। যার মধ্যে কেবল ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি ও আমানতবীমা আইন সংশোধন হয়েছে। এর আলোকে ৫টি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। আরও ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন দীর্ঘদিন ধরে অর্থমন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে।
আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ১৯৯২ সালে অর্থনীতির স্বার্থে যা বলতাম, ৩৪ বছর পর এসে সে সব সমস্যার কথা বলতে হচ্ছে।
হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এ. কে. আজাদ বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির সাথে রাজস্বসহ অনেক বিষয়সম্পৃক্ত। মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে এরই মধ্যে ১২ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছে। আমার ধারনা আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ লোক চাকরি হারাবে।
তিনি মূল প্রবন্ধের উঠে আসা কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আজকের মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তোরণ হলে রপ্তানি আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে। রপ্তানি আয়ে এরই মধ্যে প্রভাবের ফলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে। পদ্ধতিগত চাপের মাধ্যমে রপ্তানি আরও কমিয়ে দেবে এবং ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি করবে। বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার গড়ে ৫০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে গড়ে ৩০ শতাংশ।
এ. কে. আজাদ আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ। যেখানে সরকারের বেড়েছে ২৭ শতাংশ। আগামীতে এই প্রবৃদ্ধি ৩২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া শুধুমাত্র মুদ্রানীতির অর্থনীতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। নির্বাচিত সরকার আসার পর এলডিসি উত্তরণের প্রভাব কি হবে ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতার আলোকে তা বোঝাতে হবে।
