মঙ্গলবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নেই সংশোধিত শ্রম আইনেও

অর্থনীতি ডেস্ক   |   সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৮০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নেই সংশোধিত শ্রম আইনেও

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে। দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে এই সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।

অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১৯ শ্রমিক পুড়ে মারা যান। আগুন থেকে বাঁচতে লাফিয়ে পড়ে আহত হন আরও অন্তত ৫৫০ জন। আহতদের মধ্যে পরে আরও চারজন মারা যান। ওই ঘটনার ১৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ সোমবার।

ওই দুর্ঘটনার পরের বছর ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। ওই ভবনে পাঁচটি পোশাক কারখানার এক হাজার ১৭৫ শ্রমিক নিহত হন। পরপর বড় দুই দুর্ঘটনার কারণে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়ে পোশাক খাত। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করা হয়। বিদেশি ব্র্যান্ড-ক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও চাপ আসে। আইনের আওতায় দায়ীদের বিচারের দাবি এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের দাবি তোলে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক সংগঠন।

উভয় ঘটনার পরই সরকার এবং পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকা। ২০১৬ সালে আইনের সংশোধনীতে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়। ওই আইনে আহতদের ক্ষতিপূরণ আড়াই লাখ টাকা। আইএলও কনভেনশনের ১২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাজরীন ফ্যাশনসের হতাহতদের গড় বয়স ২৫ বছর। দেশের আইন অনুযায়ী, একজন শ্রমিক যদি ৫৯ বছর কাজ করতে পারে, তাহলে তাঁর কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম কমিশন ক্ষতিপূরণের একটি সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণেরও সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, আইএলওর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং দেশে হাইকোর্টের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী যেন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে ন্যায্য মানদণ্ড নির্ধারণের কথা বলা হয় প্রতিবেদনে।

জানতে চাইলে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, তাজরীন ফ্যাশনস এবং রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা অন্যান্য শিল্প খাতে কাজে লাগানো হয়নি। এ কারণে চট্টগ্রামে কনটেইনার ডিপো, নারায়ণগঞ্জে হাশেম ফুডের কারখানায়, নিমতলী ও চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ডে ক্ষতিপূরণ পাননি। অনেক দুর্ঘটনার পরে মামলা নেওয়া হয়নি। আর দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসাসেবা পাননি আহত শ্রমিকরা। তাই ক্ষতিপূরণের একটি স্থায়ী মানদণ্ড নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে কমিশনের পক্ষ থেকে।

গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ১৭ নভেম্বর জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। এতে কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রসঙ্গে বলা হয়, সরকার বিধি দ্বারা উপযুক্ত বিবেচিত কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত একটি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করবে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের গঠন, কার্যাবলি, সুবিধার প্রকার ও মাত্রা নির্ধারণ, তহবিলের অর্থের উৎস পদ্ধতি ও কার্যকর প্রশাসন এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, শ্রমিক পক্ষের মূল যে দাবি একটি স্থায়ী মানদণ্ড নির্ধারণ, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই সংশোধিত শ্রম আইনে।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সব খাতের শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এতে বলা হয়, ‘সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কোন কোন শিল্প খাতে ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রযোজ্য হবে, তাহা নির্ধারণ করিতে পারিবে এবং এইরূপ নির্ধারণের পর কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ধারা ১৫০-এর আওতায় মালিকের দায়িত্ব-সংক্রান্ত এই আইনের বিধানাবলি সংশ্লিষ্ট শিল্প বা খাতের মালিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে না।’

শ্রম আইন সংশোধন-সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পর্ষদের (টিএসএস) সদস্য সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন গতকাল বলেন, তাদের দাবি সত্ত্বেও সংশোধিত শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সব পর্যায়ের শ্রমিকরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

সরকারের কাছে লিখিত দাবি জানানো হবে। তাদের দাবি, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহতদের আইএলওর মানদণ্ড অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন। তাজরীন ফ্যাশনস কারখানা এবং রানা প্লাজা ধসে আহতদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রদানে ট্রাস্ট ফর ইনজুরড ওয়ার্কার্স মেডিকেল কেয়ার (টিআইডব্লিউএমসি) নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয় ২০১৬ সালে। আইএলওর নেতৃত্বে ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা ও অন্যান্য বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে তাদের এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত তিন কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হয়েছে। ট্রাস্টের সমন্বয়ক শাহরিয়ার রনি জানান, আইএলওর নেতৃত্বে গঠিত ওই তহবিল-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ নিয়ে টিআইডব্লিউএমসির মাধ্যমে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত তাজরীন ফ্যাশনস কারখানার গুরুতর এবং সাধারণ আহত মিলে ১৭২ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ট্রাস্টের মাধ্যমে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ