শুক্রবার ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

নির্বাচনের পর অর্থনীতিতে গতি আসবে: গভর্নর

অর্থনীতি ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১১৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

নির্বাচনের পর অর্থনীতিতে গতি আসবে: গভর্নর

আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসছে, সেটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে। এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ ছাড় ব্যতিরেকে চলতি বছর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এমসিসিআই (মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) আয়োজিত ‘অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি অনুধাবনে কাঠামোগত উদ্যোগ: পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)-এর গুরুত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান। পিআইএম নিয়ে বক্তব্য রাখেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিএসও মাশরুর রিয়াজ। এ সেমিনারে ব্যবসায়ী ও গবেষকরাও অংশ নেন।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আইএমএফের অর্থ ছাড়াই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আমরা যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছি। ভবিষ্যতে কোনো সহায়তা যুক্ত হলে সেটি হবে বাড়তি সুবিধা। তাঁর মতে, বহিঃখাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে না গেলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বর্তমানে তুলনামূলক অনুকূলে।

গভর্নর জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের পতনের ফলে সামগ্রিক পণ্যমূল্য স্থিতিশীল। এর প্রভাব হিসেবে চলতি বছরে আমদানির পরিমাণ বাস্তবে বেড়েছে এবং আমদানি পরিশোধ ৫-৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের গড় দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় কম দামে বেশি পরিমাণ আমদানি সম্ভব হয়েছে, যা সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও মজুত পরিস্থিতিকে শক্তিশালী করেছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসছে বৈদেশিক সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে। যদি এ ধারা ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, তাহলে আমরা আবার আমাদের ঐতিহাসিক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাব। এতে বাজারে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন টাকার সমপরিমাণ অর্থ যোগ হবে, যা দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কাটাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি কমে আসবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন গভর্নর।

বিনিময় হার প্রসঙ্গে আহসান এইচ মনসুর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার আরও নমনীয় করা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বেগ ছিল, যাতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে কার্যকর দিকনির্দেশনা দেবে।

‘মানি মার্কেট’ পরিস্থিতি তুলে ধরে গভর্নর জানান, একসময় তারল্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তখন মানি মার্কেটের ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ২৪-২৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ, যা টাকার অঙ্কে ট্রিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। আমানত প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ৬-৭ শতাংশে। অথচ সরকার একাই বাজার থেকে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছিল। ফলে তীব্র অর্থ সংকট তৈরি হয়েছিল।

সে পরিস্থিতি এখন পেছনে ফেলে আসা গেছে বলে জানান তিনি। চলতি বছরের ডিসেম্বরে আমানত প্রবৃদ্ধি বেড়ে প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের সমান। সরকারের প্রয়োজন মিটিয়েও বাজারে দেড় বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শূন্য অবস্থা থেকে আমরা ১.৩ বিলিয়ন ডলারের সক্ষমতায় এসেছি শুধু মানি মার্কেটের মাধ্যমেই। তাঁর প্রত্যাশা, এই অর্থ শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হবে।

গভর্নর বলেন, সামনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদারীকরণ প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে। যুদ্ধাবস্থা, আগের বিনিময় হারের বড় পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে যেসব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে না। কে কোন রাজনৈতিক দলের, তাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। কেবল যাদের ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা আছে, তাদেরই এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে গাজী টায়ার, বেক্সিমকো এবং মুন্নু সিরামিক নীতি সহায়তা পেয়েছে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে তহবিল প্রবাহ আরও জোরদার হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান বলেন, নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী অর্থনৈতিক তথ্য একটি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এমনকি কূটনীতিকদের জন্যও এ ধরনের সূচক অর্থনীতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি বলেন, ভালো নিয়ন্ত্রণ মানে বেশি নিয়ম নয়, বরং ভালোভাবে প্রণয়ন ও বাস্তবায়িত নিয়ম। পিএমআইর মতো উদ্যোগ রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশটির উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ও গতিশীলতা অত্যন্ত শক্তিশালী। এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে এবং উত্তরণের পরও একটি ট্রানজিশন পিরিয়ডে এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে।

সেমিনারে এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্যে মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে নিয়মিত, কাঠামোবদ্ধ ও সময়োপযোগী অর্থনৈতিক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান থাকলেও সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিত, দেরিতে প্রকাশিত এবং নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ।

তিনি বলেন, পিএমআই চারটি খাত– কৃষি, শিল্প, সেবা ও নির্মাণ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এবং অন্তত ৪০০ প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে মাসিক সূচক তৈরি করা হয়। নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ইনপুট মূল্য, ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাসহ বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই পিএমআই অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি দিকনির্দেশনা দেয়। ২০২০ সাল থেকে এমসিসিআইর সহায়তায় এ সূচক গণনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শুধু নয়, দেশের সুশাসন অবস্থা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

ডিসেম্বর মাসের তথ্য বিশ্লেষণে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও শিল্প ও নির্মাণ খাতে কিছুটা মন্দা ভাব দেখা গেছে বলে জানান তিনি। তবে ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা এখনও ইতিবাচক। বক্তারা বলেন, পিএমআই প্রকাশের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি কীভাবে বিশ্লেষণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে এই সূচক নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং আর্থিক ঝুঁকি মূল্যায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

পিএমআইর গুরুত্ব তুলে ধরে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, এটা দেশের সার্বিক বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বিষয়েও ধারণা দেয়। দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি কোন পথে, সে তথ্য জানা না থাকলে নীতিনির্ধারকরা সঠিক নীতি-উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হবেন।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ