শনিবার ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us
Advertise with us

কম দামের পণ্যের জন্য লাইনে বড় লড়াই

জাতীয় ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৭৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

কম দামের পণ্যের জন্য লাইনে বড় লড়াই

‘যারা ঠেলাঠেলি করতে পারে, গায়েগতরে শক্তি যাগো, টিসিবির মাল হেগো। আমি বাবা বুড়ো মানুষ; ঠেলাঠেলিতে জিততে পারি না।’ গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিটিসিএল অফিসের পাশে অসহায় কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন টিসিবির পণ্য কিনতে আসা রেহেনা বেগম। তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়েও টিসিবির পণ্য কিনতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি খালি হাতে বাড়ির পথ ধরেন।

কারওয়ান বাজারের টিসিবি ভবনের সামনে ট্রাক থেকে টিসিবির পণ্য কিনতে আসা মাহমুদ মিয়াও জানালেন লাইনে দাঁড়ানোর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘পাঁচ-ছয়জনের পরই আমি দাঁড়াইছিলাম। ধাক্কাধাক্কি লাগার কারণে লাইন ভাঙি গেছে। এখন দেখি, আমার সামনে ৫০-৬০ জন চলি আইছে। মাল পামু কিনা, আল্লাহ জানে।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের পাশে টিসিবির ট্রাকে নারী লাইনে দাঁড়ানো জাহেদা বেগম জানান, সেই সকাল ৮টা থেকে তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে। সিরিয়াল নম্বর ৫৬। তবে ভিড়ের কারণে সামনে এগোনোই যাচ্ছে না। অনেকে একবার পণ্য নিয়ে লুকিয়ে দ্বিতীয়বারও নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে লাইন এগোচ্ছে না।

রেহেনা, মাহমুদ ও জাহেদার মতো বয়স্ক ক্রেতার জন্য সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকে বিক্রি হওয়া সাশ্রয়ী দামের পণ্য কেনা বেশ কষ্টের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তাদের পণ্য কেনার সৌভাগ্য হয় না।

গতকাল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও কলোনি বাজার, প্রেস ক্লাব ও ইসিবি চত্বরে টিসিবির ট্রাকে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি। যারা সবল তাদের পেছন থেকে সামনে চলে আসতেও দেখা যায়। অন্যদিকে যারা বয়স্ক, তারা পেছনে পড়ে যান।
দুপুর সোয়া ১টার দিকে প্রেস ক্লাবের সামনে দেখা যায় টিসিবির ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষের লম্বা সারি। সবার হাতে মার্কার কলম দিয়ে ক্রম নম্বর লেখা। লাইনে দাঁড়ালেও সবাই চেষ্টা করছিলেন সিরিয়াল ভেঙে আগে পণ্য কিনতে।

রমজান উপলক্ষে সারাদেশে ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। সংস্থাটির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারছেন। প্রতি লিটার তেলের দাম রাখা হচ্ছে ১১৫ টাকা। এ ছাড়া প্রতি কেজি চিনি ৮০, মসুর ডাল ৭০, ছোলা ৬০ ও আধা কেজি খেজুরের দাম ৮০ টাকা। সব মিলিয়ে খরচ হয় ৫৯০ টাকা। বাজার থেকে সমপরিমাণ পণ্য কিনতে লাগে ৯০০ থেকে ৯২০ টাকা। সেই হিসাবে সাশ্রয় হয় সর্বোচ্চ ৩৩০ টাকা।

টিসিবি জানিয়েছে, প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকে। তবে পণ্য নিতে এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি মানুষ লাইনে দাঁড়ান।

ট্রাক থেকে তেল উধাও
টিসিবির পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাশ্রয় হয় সয়াবিন তেলে। বাজারে দুই লিটারের বোতল ৩৯০ টাকা; ট্রাক থেকে কেনা যায় ২৩০ টাকায়। এতে সাশ্রয় হয় ১৬০ টাকা। ফলে তেলের প্রতি যেমন আকর্ষণ ক্রেতার, তেমন ডিলারেরও। গতকাল দুপুর ১টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দেখা গেছে, বিক্রির শেষদিকে ৬০ থেকে ৭০ জন তেল পাননি। ১০-১২ জন ক্রেতা জানিয়েছেন, ডিলার তেল কম নিয়ে এসেছেন। তাদের অভিযোগ, অন্য জায়গায় তেল বিক্রি করা হয়েছে। টিসিবি জানিয়েছে, প্রতি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য ৮০০ লিটার তেল বরাদ্দ থাকে।

ছাত্তার জেনারেল স্টোর নামে এক ডিলার ট্রাকের পণ্য বিক্রি করছিলেন। বিক্রি তদারকির দায়িত্বে থাকা ডিলারের প্রতিনিধির কাছে তেল কম কেন– জানতে চাইলে তিনি ডিলার নন বলে সটকে পড়েন। তখন উপস্থিত ক্রেতা অনেকেই বলেন, তিনিই ডিলার। তৎক্ষণাৎ টিসিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া ডিলার ছাত্তারের মোবাইল নম্বরে ফোন করলে তিনি ধরেননি। এরপর সেখানে বিক্রির দায়িত্বে থাকা মুরাদ হোসেনের কাছে অন্য পণ্য আছে তেল নেই কেন– তিনি এর সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে ওই ট্রাকের চালক মনির হোসেন বলেন, কেউ কেউ তেল নিয়েছে অন্য পণ্য নেয়নি। সে জন্য এলোমেলো হয়েছে।

টিসিবির মুখপাত্র মো. শাহদাত হোসেন বলেন, অভিযোগ বিষয়ে যাচাই করা হবে। প্রমাণ পেলে ডিলারশিপ বাতিল করা হবে।

সিরাজগঞ্জে ইফতারের সময় বিক্রি
ঢাকার পাশাপাশি সিরাজগঞ্জেও পণ্য বিতরণে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের বদলে ইফতারের ঠিক আগে পণ্য বিক্রি শুরু করা হয়। তালিকায় উল্লিখিত স্থানের বদলে অন্য জায়গায় ট্রাক দাঁড়ায়।

গত মঙ্গলবার সিরাজগঞ্জ সদরের কাজীপুর মোড় ও হোসেনপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দুই এলাকাতেই বিকেল সাড়ে ৫টার পর পণ্য বিতরণ শুরু হয়েছে। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ক্রেতাদের অভিযোগ, বণ্টন তালিকায় যে স্থানের কথা উল্লেখ থাকে, বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে অন্য জায়গায় পণ্য বিক্রি করা হয়।

ডিলার বিসমিল্লাহ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী ইব্রাহিম করিম বলেন, সাহ্‌রি খেয়ে আমরা সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া টিসিবি ক্যাম্পে মালপত্র আনতে যাই। সেখান থেকে সরবরাহ পেতে দেরি হয়েছে। দুপুরে সিরাজগঞ্জে এসে এক হাজার ৬০০ প্যাকেট থেকে ৪০০ জনের প্যাকেজ প্রস্তুত করতেও সময় লাগে। বাধ্য হয়েই সন্ধ্যায় বিতরণ শুরু করতে হয়েছে। এশার নামাজ পর্যন্ত বিক্রি করেছি।

টিসিবির বগুড়া ক্যাম্পের সহকারী পরিচালক মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, দুপুর থেকে বিকেল ৫টার আগেই বিক্রি শেষ করার কথা। ইফতারের সময় বিক্রি হওয়ার কথা নয়। তালিকায় একটি ভুল হয়েছিল, তা সংশোধন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রামে পণ্য কিনতে ‘যুদ্ধ’

চট্টগ্রাম নগরের টেরিবাজার এলাকার বাসিন্দা রোখসানা বেগম পণ্য কিনতে এসে বলেন, রোদের মধ্যে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। সামনে লম্বা লাইন। পেছনেও মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পণ্য পাব কিনা, অনিশ্চিত। গতকাল নগরের খলিফাপট্টি, আগ্রাবাদ, কাজেম আলী রোডসহ কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা গেছে, রোখসানার মতো অনেকেই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পণ্য কিনছেন।

দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কয়েক ধরনের ভোগ্যপণ্য হাতে পেয়ে অন্যরকম উচ্ছ্বাস দেখা গেছে জুলফিকার আলীর চোখেমুখে। আছাদগঞ্জ এলাকার এ বাসিন্দা বলেন, রোদে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর পণ্য কিনতে পেরে ভালো লাগছে।

টিসিবি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিসের যুগ্ম পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, একজন যেন একাধিকবার পণ্য না নিতে পারেন, সে জন্য ক্রেতার হাতের আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগানো হচ্ছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন Orthonity Bangladesh-এর খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ