শনিবার ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us
Advertise with us

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি নেতানিয়াহুর বিপদ ডেকে আনতে পারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি নেতানিয়াহুর বিপদ ডেকে আনতে পারে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অভ্যাস আছে। তিনি নিজের চাওয়া পূরণ না হলে শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাইকে চরম পরিণতির হুমকি ও ভয়ভীতি দেখান। ট্রাম্পের ভাষায় এটিই তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের আসল রূপ।

কখনো কখনো এই কৌশল কাজে দিয়েছে। যেমন, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গাজা শান্তি চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করেন। আবার কখনো এই কৌশল খাটেনি। যেমন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপীয়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। ইরানের ক্ষেত্রেও কৌশলটি কাজ করছে না বলেই মনে হচ্ছে।

এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষমতার জোর দেখাচ্ছেন। গত সপ্তাহে বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে আমি যা চাইব নেতানিয়াহু তাই করবেন।’ এ কথা বলার মাধ্যমে ট্রাম্প এমন এক সাহস দেখিয়েছেন, যা আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে দেখাননি।

নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের এই প্রভাবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নেতানিয়াহুর এখন ট্রাম্পের সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। ইসরায়েলে খোদ নেতানিয়াহুর চেয়ে ট্রাম্প বেশি জনপ্রিয়। ফলে তিনি পেছন থেকে সরে যাওয়ার আভাস দিলে, সেটির জন্য আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে বড় মূল্য দিতে হবে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের ১৯৯১ সালের একটি সিদ্ধান্তকে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতজাক শামির অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে রাশিয়ান ইহুদি অভিবাসীদের পুনর্বাসনের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এরপর বুশ অভিবাসীদের সহায়তার জন্য দেওয়া আবাসন ঋণ গ্যারান্টি বাতিল করেন। এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে শামিরের মারাত্মক ক্ষতি করে। পরের বছরের নির্বাচনে তিনি ইতজাক রবিনের কাছে হেরে যান। রবিন ক্ষমতায় বসার কয়েক মাসের মাথায় আবাসন ঋণ গ্যারান্টি পান।

সব হারানোর শামিল
নানা ঘটনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাছাকাছি আছে। এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, তাতে সম্ভাব্য সমঝোতাটি নেতানিয়াহু এবং তাঁর অভ্যন্তরীণ প্রতিপক্ষ- উভয়ের কাছেই সব হারানোর শামিল হবে।

সম্ভাব্য সমঝোতায় ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলের কোনো শর্ত নেই। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ধরনের সামরিক হামলা সামলে নেওয়ার পর দেশটির সরকার রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি সুসংহত। তারা যখন-তখন হরমুজ প্রণালি অবরোধ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। সামরিক সংঘাতের পর ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক অবকাঠামোর ওপরও যুক্তরাষ্ট্র কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারেনি।

নেতানিয়াহুর জন্য দুর্ভাগ্য হলো- যুদ্ধ কখন, কেন, কীভাবে শুরু হবে সে সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর হয়তো বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ কখন, কীভাবে শেষ হবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় তিনি নেই বললেই চলে।

সমঝোতা স্মারক মেনে হরমুজ প্রণালি ধাপে ধাপে খুলে দেওয়া হলে এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হলে, শুরু হবে দোষারোপের খেলা। নেতানিয়াহুর বিরোধীরা বলতে শুরু করবেন, কেবল ইচ্ছা শক্তির অভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলা যায়নি। ওই মুহূর্তে নেতানিয়াহুর পক্ষে ফের যুদ্ধ শুরু করা বেশ কঠিন হবে। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোভাবেই নেতানিয়াহুর কারণে সমঝোতা স্মারক ভেস্তে দিতে চাইবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে নিজের সমালোচনা ঠেকাতে ট্রাম্প কোনোভাবেই নেতানিয়াহুর অবাধ্যতা বা নতুন সামরিক পদক্ষেপ মেনে নেবেন না। তিনি নিজেও হয়তো চাইবেন না, ওয়াশিংটন আবার যুদ্ধে জড়াক। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র আশা হতে পারে ইরানের নেওয়া কোনো ভুল পদক্ষেপ, যা পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটি ভেস্তে দেবে।

লেবাননও বিপদের কারণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে লেবানন পরিস্থিতি কীভাবে প্রভাব ফেলে সেটাই এখন দেখার বিষয়। লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ইরান সোমবার শান্তি আলোচনা স্থগিত করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহুকে ফোন করে হামলা বন্ধের চাপ দেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো চুক্তি হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে, এটি তারই একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।

দুই দেশের সমঝোতা স্মারক যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয় এবং ইরান যদি লেবাননে বাস্তবসম্মত যুদ্ধবিরতির শর্ত জুড়ে দেয়, তবে হামলা থেকে নেতানিয়াহুকে পিছু হটাতে ট্রাম্প দ্বিধা করবেন না। আর তখন নেতানিয়াহুর সামনে ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকবে না।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও দায় চাপানো
সম্প্রতি ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে ইরান চুক্তির সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ জুড়ে দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা তাঁর এই কৌশলের হিসাব মেলাতে পারছেন না। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাস্তবতার সঙ্গে এই শর্তের কোনো মিল নেই।

ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প বিকল্প কোনো হিসাব কষছেন। ইরান ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলকে চাপ দেওয়ার কারণে তিনি নিজ দেশের ভেতরে চাপে পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে হয়তো ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর সফলতা তুলে ধরে নিজেকে রক্ষা করবেন।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মূল কথা হলো- এর আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলো কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি করবে। কিন্তু পশ্চিম তীর ও লেবাননের একাংশ দখলে রাখা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনোভাবেই আরব দেশগুলো জড়াতে চাইবে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি ব্যতিক্রম কিছু করেও, অন্য দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরবের তা করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

এদিকে ইসরায়েলের ওপর বেশি চাপ দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের রিপাবলিকান সমর্থকদের অসন্তুষ্ট করতে পারে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু ট্রাম্প এমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যিনি সব সময় নিজেকে অগ্রাধিকার দিতে পছন্দ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চিন্তার কিছু নেই বলেও তিনি দাবি করেছেন।

তবে ট্রাম্পের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে একটি শব্দ- ‘পরাজয়’। এরই মধ্যে ডানপন্থীদের একাংশ বলছে, ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে হেরে গেছেন। ভবিষ্যতে এমন অভিযোগ আরও উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করবেন। সেই তালিকায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম সবার ওপরে থাকাটাই স্বাভাবিক।

(নিবন্ধটি যৌথভাবে লিখেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নীতি বিশ্লেষণের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার এবং মিসর ও ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি কার্টজার)

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন Orthonity Bangladesh-এর খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ