রবিবার ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

অপারেটর নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে দোটানায় সরকার

জাতীয় ডেস্ক   |   সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

অপারেটর নিয়োগ পদ্ধতি  নিয়ে দোটানায় সরকার

একের পর এক বৈঠক ও সিদ্ধান্ত বদলের কারণে চালু করা যায়নি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। আওয়ামী লীগ সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) জাপানের কাছে এটি পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক এই টার্মিনালের কাজ ৯৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল রোববার দ্রুত টার্মিনাল চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে আন্তর্জাতিক এ বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের অপারেটর নিয়োগ পিপিপি মডেলে হবে, নাকি জিটুজি ভিত্তিতে– তা নিয়ে নতুন সরকারও আছে দোটানায়।

গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী চান দ্রুত সময়ের মধ্যে থার্ড টার্মিনাল চালু হোক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, টার্মিনালটি কবে নাগাদ চালু হবে– এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে দ্রুত চালুর সম্ভাবনা যাচাই, বিভিন্ন কারিগরি বিষয় এবং পূর্ববর্তী জটিলতা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে আশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত (ব্রিফ) করা হয়েছে এবং তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আগামীকাল (আজ সোমবার) জাপানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথাও জানান তিনি।

থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে কিনা– এ প্রশ্নের জবাবে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ বিষয়টি জিটুজি পর্যায়ের একটি ইস্যু। এটি প্রায় ছয় বছর ধরে চলমান একটি বিষয়। সম্প্রতি বিমান মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তিনি বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।

দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর অনানুষ্ঠানিকভাবে চালু (সফট ওপেনিং) করা হয়। তবে অপারেটর নিয়োগ সম্ভব না হওয়ায় পুরোপুরি চালু করা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অপারেটর নিয়োগে বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বেবিচকের সদর দপ্তর থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় ‘তৃতীয় টার্মিনাল অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, পিপিপি কর্তৃপক্ষের সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপের সঙ্গে চলমান দর-কষাকষি নিষ্পন্ন না হলে ‘প্ল্যান-বি’ প্রস্তুত বিষয়ে আগেই আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় উন্মুক্ত দরপত্রের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এর আগে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়। তবে রাজস্ব বণ্টন, অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত শর্তে মতপার্থক্যের কারণে চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।

বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, কনসোর্টিয়ামের কিছু দাবি রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

বেবিচককে ১৬৫০ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ

তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’ নামে একটি যৌথ কনসোর্টিয়াম কাজ করছে। এতে জাপানের মিত্সুবিশি করপোরেশন, ফুজিটা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন অংশীদার।

টার্মিনাল নির্মাণকাজের অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এডিসি আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডে যায়। বোর্ড গত বৃহষ্পতিবার বেবিচককে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের রায়ে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কাজের বিল, রিটেনশন মানি এবং বিলম্বজনিত অর্থায়ন চার্জ বাবদ এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

প্রকল্পটি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি নকশাগত ত্রুটির কারণে সিলিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং টার্মিনালের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে এ অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বহন করেছে। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর এর কাজ শুরু হয়।

২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে রয়েছে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক ও ৩টি ভিআইপি ডেস্ক। টার্মিনালটি চালু হলে বিমানবন্দরের যাত্রী পরিচালন ক্ষমতা বছরে ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। আর কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে বছরে ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ