
বিনোদন ডেস্ক | সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

প্রথম কথা।
আঠারো লাইনের একটি কবিতা বনলতা সেন নিয়ে এত দীর্ঘ পথের অভিযাত্রী যে হতে পারে, তাঁকে কুর্নিশ করতেই এ সাধারণ লেখা। আমি সিনেমার সমালোচক নই। আমার ভালোলাগা আর এই দুঃসাহসিক অভিযানের অভিযাত্রীকে প্রেমিকের মতো ভালোবাসার প্রকাশ জানাতেই আমার এই লেখা।
দ্বিতীয় কথা।
যদিও নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁর বনলতা সেন সিনেমার একটি উপশিরোনাম দিয়েছেন–এ ফ্লেশ অব পোয়েট্রি। সরাসরি বললে কাব্যের দেহ বা কবিতার মাংস। আসলে এটি রূপক অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে। নিগূঢ় অর্থে কবিতা যখন নিছক শব্দ বা অক্ষরের মধ্যে না থেকে কবির নিজের রক্ত-মাংসের আবেগ ও অনুভূতির অভিজ্ঞতায় সঞ্চারিত হয়, সেটিই ফ্লেশ অব পোয়েট্রি। সেই সূত্রে দর্শক বনলতা সেন সিনেমার জার্নিতে অংশ নিতে নিতে যে যে আবেগ, অনুভূতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তাতে আমরা দেখতে পাই বনলতা সেন আর নিছক শব্দ ও অক্ষরের মধ্যে আবদ্ধ একটি কবিতা নয়। তিনি একজন রক্ত-মাংসের নারী। তাঁকে তিনি হাজির করেন ভিন্ন ভিন্ন অবয়বে। এই হাজির করানোর চিত্রকল্পনার দুর্দান্ত মুনশিয়ানা আমাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে মুগ্ধতার প্রান্তরে নিয়ে যেতে থাকে। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি–দৃশ্যের পর দৃশ্যের জন্ম হয়।
বনলতা সিনেমার দৃশ্যে মাসুমা রহমান নাবিলা, খাইরুল বাসার ও রুপন্তী আকিদ। ছবি: নির্মাতার সৌজন্যে
বনলতা সিনেমার দৃশ্যে মাসুমা রহমান নাবিলা, খাইরুল বাসার ও রুপন্তী আকিদ। ছবি: নির্মাতার সৌজন্যে
বনলতা সেন তো একটি কবিতা, সে কবিতা কোথাও ব্যবহার না করে তাকে রক্তমাংসের আবেগ অনুভূতির অবয়ব দিয়ে কবির জীবনের ফিচার দাঁড় করিয়ে দেন এই নির্মাতা। তখন বনলতা সেন খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যাই কবিকে। এই ফিচার দাঁড় করানোর ভঙিটি অভিনব। কবির সেই সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়ে আমাদের অর্থাৎ আজকের দর্শককে তিনি বর্তমানের মধ্যে আহ্বান করেন। তখন কালের দূরত্ব ঘুচিয়ে দর্শককে জীবনানন্দ দাশের মতোই পরিব্রাজক করে নেন। তখন মহিনের ভেতর দিয়ে আমরা আরেক জীবনানন্দকে আবিষ্কার করি। বনলতা সেন দেখতে দেখতে আমি বর্তমান থেকে কবি জীবনানন্দ দাশের সময় অবগাহন করি।
বনলতা সেন খুঁজতে গিয়ে নির্মাতার সঙ্গে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে যাই, ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটি, পৌরাণিক জগতের ভেতরে প্রবেশ করি। সেখানে দেখা হয় এডগার অ্যালেন পো’র হেলেনের সঙ্গে, কখনও ঢুকে পড়ি গৌতম বুদ্ধের মহা-উপাসিকা বিশাখার গৃহে, কখনও কবির খুঁড়তোতো বোন শোভনার কাছে যাই, কখনও বিপ্লবী বনলতা সেনের জেলের কামড়ায় ঢুকে পড়ি, কখনও স্তন-কর প্রথার প্রথম বিদ্রোহী নারী নাঙ্গেলির সঙ্গে তাঁর চিতার আগুনের তাপে নিজেকে দগ্ধ করি।
আঠারো পঙক্তির এই পোয়েটিক জার্নিতে ভিজ্যুয়াল আর্টের আরাম দর্শক দেখে নিক, মেটাফোরের দারুণ উৎসব আছে এই ছবিতে, তাও দেখুক। তবে প্রথাগত চিত্রনাট্যের বাইরে রচিত এই চিত্রনাট্যে গানটির কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা, আমার মতো সাধারণ দর্শকের সে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
যারা এই বনলতা সেন-এ অভিনয় করেছেন, তাঁরা সবাই যে যাঁর চরিত্রের সঙ্গে এমনভাবে মিশে ছিলেন, সেই রসায়নে আমিও দ্রবীভূত হয়েছি। এই স্বল্প পরিসরে আলাদা করে এই গুণী শিল্পীদের নাম ও অভিনয় নৈপুণ্য নিয়ে তাই কিছু বলতে চাইনি।
তৃতীয় কথা।
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল একই সঙ্গে কবি, চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী এবং সিনেমা নির্মাতা। সে কারণেই হয়তো এইরকম দুঃসাহিক অভিযান তিনি পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছেন। বনলতা সেন আসলে উত্তীর্ণ দর্শকের সিনেমা। যার আস্বাদ পেতে চাইলে এমন এক পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিয়ে দেখতে বসতে পারলে হোঁচট খাওয়ার অভিজ্ঞতা হবে না। কিন্তু তৈরি না হলেও ক্ষতি নেই। এর রূপ, রস, গন্ধ, স্বপ্ন, প্রতীক এবং অভিজ্ঞতার মায়ায় জড়িয়ে যাবে এই বাসনা করি। তবে একথা তো সত্য, পাহাড়ের শৃঙ্গ ছুঁতে চাইলে পাদদেশ থেকেই নিজেকে তৈরি করে নিয়ে বসতে হবে, নাহলে পাহাড়ে উঠতে গেলে গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
শেষ কথা। বাংলাদেশের সিনেমা প্রসঙ্গে আমাদের দেশে এতদিন দর্শক খাওয়ানোর নামে সিনেমার একটি হাস্যকর বাস্তবতা তৈরি করা হেয়েছে, যেখানে জীবন শুধু নাচে গানে আর রিরংসায় ভরপুর। সিনেমা আসলে তা নয়। এই ধারণা ঘোচাতে এসেছে যাঁরা তাদের মধ্যে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, মেজবাউর রহমান সুমনসহ আরও দু’একজন; যাদের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের ঝলকানি দেখে মনে হয়–বাংলাদেশের, বাংলা ভাষার সিনেমা করবে জগৎ জয়, সেই দিন অত্যাসন্ন।
শেষকথা বলে কিছু নেই, এইতো শুরু হয়ে গেলো। আরও আরও নতুন কাজের শুরু দেখতে চাই।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক
