Advertise with us
শিরোনাম
Advertise with us

‘ধাক্কাধাক্কিতে মনে হইছে জানডা বাইর হই গেল’

অর্থনীতি ডেস্ক   |   বুধবার, ১৩ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৮৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

‘ধাক্কাধাক্কিতে মনে হইছে জানডা বাইর হই গেল’

রুনা বেগমের হাতে সাদা চটের ব্যাগ। কড়া রোদে কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে তাঁর। তাতে ভিজছে গায়ের জামা-ওড়না। ওড়না দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টায় আইছি। পাঁচ ঘণ্টা পর পাইলাম। ধাক্কাধাক্কিতে মনে হইছে জানডা বাইর হই গেল।’

গতকাল মঙ্গলবার সকালে মিরপুর ২ নম্বরে মিরপুর সরকারি মহিলা কলেজের পাশে টিসিবির পণ্য কেনার পর এসব কথা বলেন ৪৮ বছরের রুনা। সেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল বিক্রি করা হচ্ছিল।

সরেজমিন দেখা গেছে, দীর্ঘ সময়ে ট্রাকের পেছনে লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন রুনা বেগম। সারিতে পুরুষের চেয়ে নারীর ভিড় বেশি থাকায় কার আগে কে পণ্য কিনবেন, তা নিয়ে তাদের মধ্যে একরকম যুদ্ধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত বেলা আড়াইটার দিকে তিনি পণ্য কিনতে সক্ষম হন।

পণ্য কেনার পর ছবি তুলতে চাইলে রুনা বেগম হাতজোড় করে ছবি না তোলার অনুরোধ করেন। পরিচয় দিয়ে টিসিবির পণ্য কেনায় তাঁর কত টাকা বাঁচল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছু না কিছু তো বাঁচল। এটাও-বা কে দেয়!’ আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বড় বিপদে পড়ে আইছি। পাঁচ মাসের একটি নাতনি আছে। বাচ্চাটার জন্য খুব মায়া লাগে। তার মুখের দিকে চাইলে ঘরে বইসা থাকতে পারি না। মেয়ে হওয়ার পর ছেলেটা সংসারের কোনো খোঁজ নেয়নি। এখন বউ-নাতনি আমার ঘাড়ে।’
রুনা বেগম জানান, তাঁর বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বারে। পরিবার একেবারে গরিব ছিল না। দুই ছেলে বিয়ে করেছে। এক মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। তবে, বড় ছেলে অন্য জায়গায় চলে গেছে। কিন্তু তাঁর মেয়ে ও স্ত্রী রয়ে গেছেন রুনাদের সঙ্গে। রুনার স্বামী মিরপুরে সবজি বিক্রি করেন। এতে যা আয় হয়, তা দিয়ে কষ্টে চলে ছেলের বউ-নাতনিসহ তাঁদের চারজনের সংসার। সামান্য কয়েকটা টাকা বাঁচাতে টিসিবির পণ্য কিনতে এসে এত কষ্ট সহ্য করেছেন।

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত সোমবার রাজধানীসহ সারাদেশে ট্রাকে করে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সাধারণ ক্রেতারা টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে দুই কেজি ভোজ্যতেল, এক কেজি চিনি ও দুই কেজি মসুর ডাল কিনতে পারছেন। সব পণ্য একসঙ্গে কেনার জন্য ক্রেতার খরচ হবে ৪৮০ টাকা। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত ভোজ্যতেল ১৯৯ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকা এবং প্রতি কেজি মসুর ডাল ১০০ থেকে ১০৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজার থেকে এসব পণ্য কিনতে লাগে ৭০৩ থেকে ৭১৮ টাকা। সেই হিসাবে একজন ক্রেতার সাশ্রয় হচ্ছে ২২৩ থেকে ২৩৮ টাকা। এই টাকা সাশ্রয়ের জন্য টিসিবির ট্রাকের পেছনে ক্রেতাদের করতে হয় দীর্ঘ সংগ্রাম। অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপরও বাজারদরের চাপ সামলাতে টিসিবির ট্রাক এখন অনেক পরিবারের শেষ ভরসা। টিসিবির এই বিক্রি চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। তবে শুক্রবার বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

গতকাল বিকেল পৌনে চারটার দিকে মিরপুর সনি সিনেমা হলের পূর্ব পাশের রাস্তায় দেখা যায় এক বৃদ্ধকে (৭০)। তিনি হুইলচেয়ারে বসে আছেন। চেয়ারটি ঠেলছেন তাঁর স্ত্রী (৬০)। হুইলচেয়ারটি এসে থামলো টিসিবির ট্রাকের কাছে। ৪৮০ টাকায় পণ্য কিনলেন এই দম্পতি। পণ্য কেনার ভিডিও করতে চাইলে বৃদ্ধ লোকটি বলেন, ‘বাপু হামাক ভাইরাল কইরো না। হামি ভিক্ষুক মানুষ। ভিডিও দেখলে হামার বিটিঘোরে বাড়িত পাঠায়া দিবে জামাইরা। অনেক কষ্টে জীবন চালাচ্ছি। তোমাক অনুরোধ করিচ্ছি। হামাক ভাইরাল কইরো না।’

এই বৃদ্ধের বাড়ি বগুড়া সদরে। তিনি চাকরি করতেন মটরওয়ার্কশপে। দুর্ঘটনায় পায়ে বড় চোট পান। এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না। থাকেন মিরপুর কবরস্থান এলাকায়। প্রতিমাসে বাসা ভাড়া গুনতে হয় ২৩০০ টাকা। এর বাইরে দুজনের খাওয়া-খরচ জোগাতে অন্যের কাছে হাত পাতেন।

মোটামুটি আয় করেন, এমন অনেককেও দেখা গেছে টিসিবির পণ্য কিনতে। তেমনি একজন জুয়েল রানা। গতকাল তিনিও সনি সিনেমা হলের পাশে থেকে টিসিবির পণ্য কিনেছেন। তিনি পেশায় ‘পাঠাও’-এর মোটরসাইকেল চালক। মোটরসেইকেলে করে দুই সন্তানকে নিয়ে পণ্য কিনতে এসেছেন। দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে পণ্য কেনার সুযোগ পান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাইড শেয়ারিংয়ে আগের মতো ইনকাম নাই। তাছাড়া রাস্তায় আবার ট্রাফিকের হয়রানি বেড়েছে। আজ রাস্তায় বের হইনি। দাম কিছুটা কম। সেজন্য টিসিবির পণ্য কিনলাম।’

গতকাল মিরপুরের এই দুটি স্থানে সরেজমিন দেখা গেছে, পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা তিন গুণ। নারীদের মধ্যে বেশিসংখ্যক ছিলেন ৬০-৭০ বছর বয়সী। মধ্য বয়সীদের কাউকে কাউকে ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

গতকাল সকালে টিসিবির ট্রাক আসবে, এমন খবর পেয়ে সনি সিনেমা হলের পাশে জড়ো হতে থাকেন ক্রেতারা। বেলা দেড়টা পর্যন্ত ট্রাক না আসায় অনেকেই ফিরে যান। পৌনে দুইটার দিকে একটি ট্রাক আসে। তবে, ট্রাকটি সেখানে না থেমে মিরপুর ২ নম্বরের দিকে চলে যায়। একদল ক্রেতা ওই ট্রাকের পেছন পেছন ছুটতে থাকেন। ট্রাকটি মিরপুর সরকারি মহিলা কলেজের ফটক পার হয়ে থামে। এরপর সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করতে থাকা ক্রেতা এবং সনি হলের দিক থেকে আসা ক্রেতাদের মধ্যে সারিতে দাঁড়ানো নিয়ে শুরু হয় ঠেলাঠেলি। নারীদের কেউ কেউ অন্যদের ওপর হাত তুলেছেন। একজনের ধাক্কায় অন্যজন পড়ে গেছেন, এমন দৃশ্যও দেখা গেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertise with us

ফলো করুন Orthonity Bangladesh-এর খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ