Advertise with us
শিরোনাম
Advertise with us

বাংলাদেশে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি

অর্থনীতি ডেস্ক   |   বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৬৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর। দারিদ্র্য বাড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি দুর্বল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। এসব সম্মিলিত দুর্বলতার কারণে চলতি অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। নতুন করে দারিদ্র্যসীমার কবলে পড়তে পারে অনন্ত ১২ লাখ মানুষ। বিশ্বব্যাংক গত জানুয়ারিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাক্কলন করেছিল।

‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ নামে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। বুধবার সংস্থার ঢাকা অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ঢাকা কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা, বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, বেসরকারি খাত বিশেষজ্ঞ ম্যাগুয়ে দিয়া প্রমুখ।

বিশ্বব্যাংক অবশ্য বলেছে, গত জাতীয় নির্বাচনের পর টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। প্রতিবেদনে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের উন্নয়নে জরুরি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংস্কারে অগ্রাধিকার হিসেবে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি নীতি-পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব ব্যয়ের ওপর চাপ। এ ছাড়া আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি কমে আসা ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণে চলতি হিসাবের ভারসাম্য আরও দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ধাক্কা সামলানো কঠিন হবে এবং সাধারণ মানুষ বিশেষ করে অতি দরিদ্রদের জীবনে যে অভিঘাত তা থেকে সুরক্ষা দেওয়া সহজ হবে না। এসব কারণে ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। এই সংঘাত না থাকলে প্রাক্কলন অনুযায়ী ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারত।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, ২০২২-২৫ তিন বছরে দারিদ্র্য বিমোচন ও জনকল্যাণ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক মনে করে, এরপরের তিন বছর দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন, ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা (প্রতিদিন তিন ডলার আয়) অনুযায়ী, গত তিন বছরে অতিরিক্ত ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়েছে। ২০২৬ সালে বৈষম্য আবার বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনে নিম্নমুখী সংশোধন

প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৯ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে সংস্থার বাংলাদেশ আউটলুক প্রতিবেদনে এ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির অনুমান কমানোর কারণ মূলত চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগের মন্দাভাব ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতার মতো পরিস্থিতি।

বিশ্বব্যাংকের মতে, গত অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে– যা তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ ছিল, বেসরকারি বিনিয়োগের সংকোচন, যা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৃদ্ধি পাওয়া রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ খরচ এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে আমদানি ও জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় তা এখনও উচ্চ হারেই থেকে যেতে পারে। একইভাবে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও রাজস্ব ঘাটতি আরও বেড়ে যাতে পারে, যার মূল কারণ হলো জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি।

নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

প্রতিবেদনে সংস্কার প্রশ্নে সুপারিশে বলা হয়, বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুশৃঙ্খল সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন, যা বিদ্যমান অসংগতিগুলো দূর করবে এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বহুমুখীকরণকে সক্ষম করে তুলবে। ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় কমাতে সংস্কার ব্যবসা পরিবেশ উন্নত প্রতিযোগিতার পরিবেশ উন্নত করবে, অনানুষ্ঠানিক খাতের সমস্যা মোকাবিলা করবে এবং বেসরকারি মূলধন সংগ্রহকে সহজ করবে। বাণিজ্য বাধা কমিয়ে আনতে বাণিজ্য সংস্কার, বাজার ও খাতভিত্তিক সংস্কার, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে দৃশ্যমান ফলাফল বয়ে আনবে, কারণ এসব খাতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংস্কার কাঠামোর একটি মূল নীতি হলো আধুনিক নিয়মকানুনের দিকে অগ্রসর হওয়া। এর অর্থ হলো কম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্য নিয়ম মেনে চলার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করা।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কমবে

একই দিনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আঞ্চলিক রিপোর্ট ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট’ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৭ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি আবার ৬.৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি মন্দাভাব সত্ত্বেও অন্যান্য উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির গতি এখনও বেশি।

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, ‘চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক পরিবেশ সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শক্তিশালী। দেশগুলোকে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ নীতি সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertise with us

ফলো করুন Orthonity Bangladesh-এর খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ