শনিবার ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us
Advertise with us

জ্বালানির ধাক্কায় মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ বাড়তে পারে

অর্থনীতি ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৬৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জ্বালানির ধাক্কায় মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ বাড়তে পারে

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার যুদ্ধ জ্বালানি উৎপাদন, তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল, এবং আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাপ্লাই চেইনের ওপর দেশের চরম নির্ভরশীলতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।

জ্বালানিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ এখন ঝুঁকির মুখে। সাম্প্রতিক হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি সংকট আরও গভীর হয়েছে। ক্ষেত্রে ধাক্কাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ আগে থেকে কাঠামোগত গ্যাস ঘাটতিতে রয়েছে।

গবেষণা সংস্থা সানেম নিজস্ব গবেষণায় মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি প্রধান ট্রান্সমিশন চ্যানেল চিহ্নিত করেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এই তিনটি চ্যানেল হলো জ্বালানি, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থা। জ্বালানি চ্যানেলটি নির্দেশ করে যে, যেহেতু বাংলাদেশ আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই তেল ও গ্যাসের দামের অস্থিতিশীল ও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেশের আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে, চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি করবে। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য, সানেম ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’- এর কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম মডেল ব্যবহার করে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি সিমুলেট করেছে।

এই মডেল অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে জ্বালানি মূল্যের এই ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্রভাবে বাড়বে, যেখানে ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় এক শতাংশ কমে যেতে পারে পারে, যা মূলত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

এই ধাক্কার অসম প্রভাব বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট, যেখানে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন প্রায় ১.৫ শতাংশ, পরিবহন খাতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষি উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি-নিবিড় উৎপাদন খাতে ২.৫ শতাংশ পতন হতে পারে।

সানেম মনে করে, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে সরকারি বার্তার সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সুস্পষ্ট অমিল রয়েছে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত সরকারের প্রতি সানেম কিছু সুপারিশ করেছে। সংস্থাটি মনে করে, জমি এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সবচেয়ে সহজলভ্য ও কার্যকর বিকল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নেট-মিটারিং ছাড়পত্র দ্রুততর করে এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোগে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও শিল্পখাতের রুফটপ সোলার (ছাদে সৌরবিদ্যুৎ) প্রকল্প ত্বরান্বিত করতে হবে।

সানেমের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো এবং এর সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন জাতীয় বাজেটে উল্লেখযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার মাধ্যমে সরকার দেশকে আমদানি করা অস্থিতিশীল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনতে পারে। করমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম এবং সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণের মতো আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, সেইসাথে জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকিকে নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তরের মাধ্যমে নতুন সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বাধাসমূহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।

সানেমের সুপারিশ, স্থায়ী জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরিভিত্তিতে আমদানিভিত্তিক জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্যায়ন প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি পেতে বহুজাতিক চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী এবং ঘন ঘন সংকটের কারণে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজির জন্য একটি ‘কৌশলগত জাতীয় মজুত’ (স্ট্র্যাটেজিক ন্যাশনাল রিজার্ভ) গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এটি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে যেকোনো ব্যাঘাত এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় দেশকে প্রস্তুত রাখবে।

সানেমের মতে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি রেশনিং (কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ফুয়েল পাস) বাস্তবায়ন করা, শিল্পখাতের উৎপাদন শিফটগুলোকে অফ-পিক আওয়ারে স্থানান্তর করা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময়সীমা কমিয়ে আনা সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে সংরক্ষিত সীমিত জ্বালানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে (যেমন: কৃষি এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত) সরবরাহ করা সম্ভব হবে। নির্ভরযোগ্য বেইসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং অস্থিতিশীল এলএনজি বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে, মধ্যমেয়াদে দেশের ভেতরে স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন Orthonity Bangladesh-এর খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ