
খেলাধুলা ডেস্ক | বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ফুটবল আবেগের এক ভিন্ন ক্যানভাস। ৯০ মিনিটের লড়াই। মাঠে ও মাঠের বাইরে। খেলোয়াড়ি নৈপুণ্যের পাশাপাশি ডাগআউটে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের শেষদিকের মুহূর্তগুলো এ সত্যকেই আবার প্রমাণ করল।
মঙ্গলবার রাতের ওই ম্যাচে রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্ত ঘিরে মিসর শিবিরে ক্ষোভ যখন আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছিল, ঠিক তখনই ক্যামেরার লেন্স কেড়ে নেন তাদের প্রধান কোচ হোসাম হাসান। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে নিজের দুই হাত মাথার ওপর আড়াআড়ি উঁচিয়ে ‘এক্স’ বা ‘ক্রস’ সংকেত প্রদর্শন করেন তিনি। মুহূর্তে সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিকমাধ্যমে।
কিন্তু এই সংকেতের আসল অর্থ কী? ফুটবল ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপট জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে?
ফুটবল মাঠে বা ডাগআউটে কোচের দুই হাত আড়াআড়ি করে ‘ক্রস’ চিহ্ন দেখানো মূলত একটি প্রতিবাদ। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার ফুটবলে এই অবাচনিক বা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির দুটি অর্থ রয়েছে। একটি হলো- ‘সিস্টেমের জালিয়াতি’ বা ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ, অন্যটি- অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনড় থাকার ঘোষণা।
সাধারণত কোনো দল যখন মনে করে, মাঠের রেফারি উদ্দেশ্যমূলক প্রভাবশালী কোনো দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন এই অঙ্গভঙ্গি করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, ম্যাচটি আসলে সততার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে না। আবার অনেক দেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে ক্রস চিহ্ন ‘শৃঙ্খলিত’ থাকার বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
ফিফার ‘লজ অব দ্য গেম’ যা বলে
আবেগ যতই তীব্র হোক, ফুটবল ম্যাচ পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট নিয়মে। ফিফার অফিশিয়াল গাইডলাইনের (ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড) ‘ল ১২’ (ফাউল ও অসদাচরণ) এবং ‘ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোড’-এ ডাগআউটে আচরণের সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ রয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ম্যাচের কর্মকর্তাদের (রেফারি, সহকারী রেফারি বা চতুর্থ রেফারি) যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা মৌখিক অতিরিক্ত ক্ষোভ প্রকাশ সরাসরি তাদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন হিসেবে গণ্য হবে। এই নিয়ম অনুযায়ী, মিসরের কোচের অঙ্গভঙ্গি যদি রেফারিকে উদ্দেশ্য করে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বা ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বোঝাতে করা হয়ে থাকে, তবে তা ফিফার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আবার ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোডের ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা এমন কোনো আচরণ বা সংকেত প্রদর্শন করেন যা ফুটবলের মূল চেতনাকে আঘাত করে অথবা ফিফার সততাকে বিশ্ববাসীর সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
কোচ কি এমন আচরণ করতে পারেন?
খেলার খেরোখাতা ঘেঁটে সরাসরি উত্তর দিলে বলতে হয়- না, ফিফার নিয়মের মধ্যে থেকে কোনো কোচ এমন উসকানিমূলক আচরণ করতে পারেন না। ফিফার বিধান বলে, কোচের জন্য মাঠের পাশে যে ‘টেকনিক্যাল এরিয়া’ বা ডাগআউট থাকে, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের দলের খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দিতে পারেন। কিন্তু মাঠের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে কিংবা রেফারিকে অপমান করার মতো কোন সংকেত তিনি দিতে পারেন না।
হোসাম হাসান খেলোয়াড় হিসেবে আফ্রিকার ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি। কোচ হিসেবেও বেশ পরিচিত। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি যে আচরণ করেছেন তা সরাসরি রেফারি ও ফিফার কর্তৃত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সামিল। এজন্য ম্যাচ রেফারি চাইলে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারতেন।
ম্যাচ কমিশনার ও রেফারির রিপোর্টের ভিত্তিতে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি তার এই আচরণ খতিয়ে দেখছে বলে জানা যাচ্ছে। দোষী প্রমাণিত হলে তাকে মোটা অংকের আর্থিক জরিমানা এবং পরবর্তী কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিষিদ্ধ করা হতে পারে।
ফুটবল ইতিহাসে ডাগআউটে এমন নাটকীয় প্রতিবাদ নতুন নয়। এমন ঘটনার সবচেয়ে বড় ও আলোচিত উদাহরণ হলেন হোসে মরিনহো। ২০১০ সালে ইতালিয়ান সিরি-আ লিগে ইন্টার মিলানের তৎকালীন কোচ মরিনহো সাম্পদোরিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচে ‘আপত্তিকর’ আচরণ করেন। দলের দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড পাওয়ার পর ক্যামেরার দিকে দুই হাত আড়াআড়ি করে দেখান তিনি, যার অর্থ হলো- তার দলকে অন্যায়ভাবে হারিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই ঘটনার পর ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন মরিনহোকে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ এবং ৪০ হাজার ইউরো জরিমানা করে। ফুটবলের ইতিহাসে ঘটনাটি মরিনহোর ‘হাতকড়া’ শিরোনামে পরিচিত। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে হোসাম হাসানের হাত আড়াআড়ি সংকেতটি আমাদের মরিনহোর সেই আচরণের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এ ধরনের ঘটনার অবশ্য মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। যখন কোনো ম্যাচে তথাকথিত ‘দুর্বল’ দলগুলো ‘ফুটবল পরাশক্তি’ আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের মতো দলের মুখোমুখি হয়, তখন মাঠের রেফারি সাধারণ ভুল করলেও ফুটবলার বা কোচদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়। সেটি হলো- তারা পদ্ধতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। মিসরীয় কোচ হোসাম হাসানের আচরণ হয়ত তেমন ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।
তবে সমালোচকরা বলছেন, কোচ হোসাম যে সংকেত দিয়েছেন, তা হয়ত সাময়িক তার দেশের সমর্থকদের মনে বীরত্বের অনুভূতি দিয়েছে, কিন্তু ফিফার নিয়মের বেড়াজালে এটি নিশ্চিত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেননা, রেফারিংয়ের ভুল ত্রুটি মূল্যায়নে ফিফার নিজস্ব পর্যালোচনা ব্যবস্থা রয়েছে। ডাগআউট থেকে ম্যাচকে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে ইঙ্গিত করার স্বাধীনতা ফিফা কাউকে দেয় না।
এটিও ঠিক, মিসরের কোচের ওই আচরণের পেছনে কেবল মাঠের রেফারিং নয়, বরং ফিফাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক ধরনের অবিশ্বাসের আবহও কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক এই সংস্থা যুগে যুগে নানা বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বার্থে বড় দলগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা- ফিফার বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ। ফলে, যখনই রেফারি ‘ছোট’ বা ‘দুর্বল’ দলের বিপক্ষে বাঁশি বাজান, তখনই ফুটবলপ্রেমীদের মনে পুরোনো অবিশ্বাস মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
