Advertise with us
শিরোনাম
Advertise with us

এশিয়ার অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের দ্বিতীয় ধাক্কা আসছে

অর্থনীতি ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৭৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

এশিয়ার অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের দ্বিতীয় ধাক্কা আসছে

অর্থনীতির ইতিহাস দেখাচ্ছে, যতবারই তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, ততবারই বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মুখে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছুর আশা করা হচ্ছে না। ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে ও মানুষ খরচ কমাতে শুরু করেছে। কর আদায় কমার শঙ্কায় কিছু দেশের সরকার আরো বেশি ঋণ করছে। যা এরইমধ্যে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের বড় ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। এ অঞ্চলে এরইমধ্যে জ্বালানি সংকটের দ্বিতীয় ধাক্কার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মুদ্রার মান কমে গেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এ অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের খাদ্য ও জ্বালানির দাম আরো বাড়বে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে মন্দার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিজনেস স্কুল ইনসিড-এর অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক দত্ত পুশান বলছেন, এশিয়া সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত অবস্থায় আছে। কারণ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বাদে এ অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই বড় মাপের তেল আমদানিকারক। দেশগুলো শিল্পোন্নত হওয়ায় প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।

যদি জুন মাসের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির (এনটিইউ) সহযোগী অধ্যাপক চেন চিয়েন-মিং এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। এই প্রণালি প্রায় ৭০ দিন ধরে বন্ধ থাকায় বর্তমানে ঘাটতির পরিমাণ ১০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি দাঁড়িয়েছে।

তবে আপাতত তেলের বাজার দর তুলনামূলক স্বাভাবিক। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। একইভাবে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড অয়েলের দামও গত সপ্তাহে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। অধ্যাপক চেন বলছেন, বাজারে গা-ছাড়া ভাব দেখা গেলেও স্পষ্টতই তেলের ঘাটতি আছে। যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হবে- এমন আশায় দামের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বাজার বনাম বাস্তব পরিস্থিতি
জেপি মরগানের বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বৈশ্বিক তেলের মজুত তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এই মজুত মূলত একটি ‘শক অ্যাবজরবার’ বা অভিঘাত প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম খুব বেশি বাড়েনি।

অধ্যাপক চেন বলছেন, ‘দামের চাপ এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। আমরা এখনো এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছাইনি যেখান থেকে আর ফেরার পথ নেই।’ তবে সেই চরম সীমাটি দ্রুতই ঘনিয়ে আসছে।

জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে মজুত থাকা ৮৪০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে মাত্র ৮০ কোটি ব্যারেল প্রকৃতপক্ষে ব্যবহারযোগ্য। এর বাইরে মজুতে হাত দিলে পুরো ব্যবস্থাটি চরম সংকটে পড়বে। এপ্রিলের শেষ নাগাদ বিভিন্ন দেশের সরকার এই যুদ্ধের প্রভাব সামাল দিতে ইতোমধ্যে ২৮ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে।

জেপি মরগানের বৈশ্বিক কমোডিটি রিসার্চ প্রধান নাতাশা কানেভার নেতৃত্বাধীন একটি বিশ্লেষক দল সম্প্রতি তাদের নোটে লিখেছে, স্থলভাগে মজুতের মাত্র একটি অংশ (প্রায় ৫৮ কোটি ব্যারেল) সহজেই ব্যবহার করা যায়। বাকি তেল মূলত পাইপলাইন পূর্ণ রাখতে, ট্যাংকের সর্বনিম্ন স্তর ধরে রাখা এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যত আটকে আছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণও তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সংকট সেই সংঘাতের চেয়ে গুণগতভাবে আলাদা। তখন তেলের দাম বেড়েছিল মূলত রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে। বর্তমানের মতো তখন সরবরাহ ঘাটতি ছিল না।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এশিয়া-প্যাসিফিক রিফাইনিং ও তেল বিষয়ক গবেষণা পরিচালক সুশান্ত গুপ্ত বলছেন, রাশিয়া তখনো বিকল্প উপায়ে বাজারে তেল বিক্রি করেছিল। তাই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে ইরান সংঘাতের তুলনা করা ঠিক হবে না।

একটি ‘ব্যাকওয়ার্ডেটেড’ বাজার
মজুত ব্যাপক হারে কমলেও সুশান্ত গুপ্তের মতে বাজার এখন ‘ব্যাকওয়ার্ডেটেড’ অবস্থায় আছে। এর অর্থ- তেলের বর্তমান দামের চেয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দাম কম। ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে ‘চাহিদা হ্রাসের’ বিষয়টি মাথায় রেখে দাম নির্ধারণ করেছেন। কারণ, উচ্চমূল্যের কারণে ভোক্তা ও কোম্পানিগুলো তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে শুরু করেছে।

এশিয়ার উন্নয়নশীল অনেক দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিপাইন চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। থাইল্যান্ডের সরকার কর্মীদের হাফ হাতার শার্ট পরার এবং এসির তাপমাত্রা ২৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর ওপরে রাখার আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার কমানো এবং বাড়িতে বসে কাজ করার অনুরোধ করেছেন।

দ্বিতীয় ধাক্কা: খাদ্য সংকট, মুদ্রার পতন ও মন্দা
এশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এনটিইউ-এর অধ্যাপক চেন। তিনি বলছেন, অর্থনীতির ইতিহাস পর্যালোচলা করলে দেখা যায়, তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পর প্রতিবারই মন্দা দেখা দিয়েছে। সবকিছুর দাম বেড়ে যায়, মানুষ খরচ কমিয়ে দেয়, সরকারের ট্যাক্স আদায় কমে যায় এবং আরো বেশি ঋণ নিতে হয়। এই ঋণ আবার মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। এটি একটি চক্রের মতো কাজ করে। এবারও ব্যতিক্রম হবে না।

ইনসিড-এর অধ্যাপক পুশানের পূর্বাভাস হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ যেমন- থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মুদ্রার মানে পতন ঘটতে পারে। তেল আমদানিকারক বড় দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ওই দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবেন। নিজেদের অর্থ সরিয়ে নিতে শুরু করবেন।

অধ্যাপক পুশান জানান, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যে ভারতীয় রুপি, ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়া এবং ফিলিপাইনের পেসোর মতো এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর মান রেকর্ড পরিমাণে কমেছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপরও পড়তে পারে। ডিজেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা চাষাবাদ কমিয়ে দিতে পারেন, যা আশঙ্কাজনকভাবে খাদ্য সংকট তৈরি করবে। অধ্যাপক চেন সতর্ক করে বলছেন, এশিয়ায় শস্য রোপণের প্রথম মৌসুম আসছে। কিন্তু থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর কৃষকরা চাষাবাদের কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন না, লোকসানের শঙ্কায় আছেন। অনাহারের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই পরিকল্পনা করা উচিত।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertise with us

ফলো করুন Orthonity Bangladesh-এর খবর

সম্পাদক
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
যোগাযোগ