
জাতীয় ডেস্ক | সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ১০০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বৈশ্বিক অস্থিরতা, পণ্যমূল্য ও বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিগত সময়ে সৃষ্ট নানা অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও গতিশীল করতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিনের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে অর্থমন্ত্রী এ কথা জানান ৷ এ সময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, পণ্যমূলোর চাপ, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিগত সময়ে সৃষ্ট নানা অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আরও পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস হতে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অত্যধিক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত অর্থায়নে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সাপোর্টসহ জ্বালানি সাশ্রয়ে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অর্থনীতির ভিত মজবুত করা, মানুষের কষ্ট লাঘব করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের উল্লেখযোগ্য গৃহীত ও গৃহীতব্য পদক্ষেপগুলো হলো-
ক) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, খাদ্যপণ্য আমদানি ও মজুদ ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক আর্থিক ও রাজস্ব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
খ) বৈদেশিক খাত শক্তিশালী করা, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হারকে আরও স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এতে বহিঃখাতের চাপ কমবে এবং অর্থনীতির ওপর আস্থা আরও বাড়বে।
গ) ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে অনিয়ম কমানো, দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা চিহ্নিত করা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা, ঋণ আদায় জোরদার করা এবং সামগ্রিকভাবে ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতকে আরও জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করার কাজ চলছে।
ঘ) রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর ব্যবস্থা সহজ করা, সরকারি আয় বাড়ানোর জন্য কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কর প্রদানের পদ্ধতি সহজ করা, কর ফাঁকি কমানো এবং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
ঙ) সামাজিক সুরক্ষা ও নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তা: মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে নিম্নআয়ের মানুষকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, মা ও শিশু সহায়তাসহ বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০ রাখ দরিদ্র পরিবারকে এ কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সকল পরিবারকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ, খাদ্য সহায়তা ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
চ) বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জটিলতা কমানো, বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া, শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং যুবসমাজকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ছ) সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি: সরকারি অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা ফলপ্রসূভাবে ব্যয় হচ্ছে তা আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং জনগণের অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
জ) খাদ্য, কৃষি ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা, সার ও জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেওয়া এবং দেশীয় জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন ও ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন, বাজার ও জনজীবনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা মিলবে। এ লক্ষ্যে সরকার কৃষি কার্ড প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
ঝ) দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার: অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত শক্তিশালী করতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন অর্থায়নের বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক মন্দা ও বহিরাগত ঝুঁকির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা মোকাবিলায় বর্তমান সরকার অর্থনীতির ভিত মজবুত করা, জনগণের কষ্ট লাঘব করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং একটি সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
